স্বামী-স্ত্রীর লুটপাট কোম্পানি: রিজওয়ানা হাসানকে ঘিরে নতুন বিতর্ক
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। চটপটে, সুন্দরী এবং সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন—এই পরিচয়েই দীর্ঘদিন ধরে সুশীল সমাজে পরিচিত একটি নাম। তবে সমালোচকদের মতে, তার পরিচিতি মূলত ব্যক্তিত্ব ও কথার জোরে; আইনের ক্ষেত্রে তার উল্লেখযোগ্য উচ্চতর ডিগ্রি বা মৌলিক গবেষণার উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না। তবু তিনি পরিবেশ আইনজীবীদের সংগঠন বেলার নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো ও সেমিনারে পরিবেশ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।
রিজওয়ানার পারিবারিক পরিচয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তার বাবা প্রয়াত সাবেক প্রতিমন্ত্রী রাজাকার সৈয়দ মহিবুল হাসান, যিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট-বাহুবল এলাকায় তিনি কুখ্যাত রাজাকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করে। স্বাধীনতার পর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠায় তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় আবার প্রকাশ্যে আসেন এবং ১৯৮৬ সালে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতনের পর আবারও আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পড়াশোনা শেষ করার পর সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ড. মহিউদ্দিন ফারুকের প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ আইনজীবী সমিতিতে যুক্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার সঙ্গে ড. ফারুকের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে ড. মহিউদ্দিন ফারুকের অকাল মৃত্যুর পর তিনি বেলার নির্বাহী পরিচালক হন। সমালোচকদের মতে, সেই সময় থেকেই সংগঠনটির কার্যক্রমের ধরণ পরিবর্তন হতে শুরু করে। পরিবেশ আইন নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতার পরিবর্তে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে চাপ সৃষ্টি এবং নানা ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েন রিজওয়ানা।
এই সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লেখা শুরু করেন এবং সুশীল সমাজের আলোচনায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। এদিকে তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী (এবিসি) আওয়ামী লীগের সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি নারায়ণগঞ্জে হামিদ ফ্যাশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৪ সালে আবু বকর সিদ্দিকী রহস্যজনকভাবে অপহৃত হন। বিষয়টি তখন বেশ আলোচিত হয়। পরে এটি একটি সাজানো ঘটনা ছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের মতে, আলোচনায় আসার জন্যই এই নাটক সাজানো হয়েছিল। এই ঘটনার পরই অনেকের কাছে স্পষ্ট হয় যে, এবি সিদ্দিকী হামিদ ফ্যাশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন, যা নসরুল হামিদ বিপুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় রিজওয়ানার তেমন কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আসিফ নজরুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং কয়েকটি প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে তিনি উপদেষ্টা পদে আসীন হন। সমালোচকদের দাবি, উপদেষ্টা হওয়ার পর থেকেই রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন খাত থেকে দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহে রিজওয়ানার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন তার স্বামী এবি সিদ্দিকী। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৮ মাসে পরিবেশ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তদবির ও অনিয়মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই দম্পতি।
উপদেষ্টা হওয়ার আগে রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পত্তি নেই। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, এবি সিদ্দিকী নসরুল হামিদ বিপুর বিভিন্ন সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের মধ্যস্থতাও করেছেন। রাজধানীর গুলশান ক্লাবের বিপরীতে নসরুল হামিদের নামে থাকা এক বিঘা জমির একটি প্লট নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নসরুল হামিদের সম্পত্তি ক্রোকের উদ্যোগ নিলেও এই প্লটটি তালিকায় ছিল না। অনুসন্ধানে অভিযোগ ওঠে, রিজওয়ানার তদবিরে এটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমান বাজারমূল্যে জমিটির দাম প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হয়।
রাজধানীর মাদানী এভিনিউর ১০০ ফুট রাস্তার পাশেও নসরুল হামিদের প্রায় ৫ বিঘা জমি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বড় আকারে ক্রেতা না পাওয়ায় ছোট ছোট অংশে জমি বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছেন এবি সিদ্দিকী। একই সঙ্গে হামিদ রিয়েল এস্টেটের অঘোষিত মালিক হিসেবেও তাকে উল্লেখ করা হয়।
পলিথিন বাণিজ্য নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং শপিং মলে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। কিছুদিন অভিযান চললেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, পলিথিন উৎপাদকদের সঙ্গে সমঝোতার পর অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।
সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্র নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তা কার্যকর হয়নি। কয়েক মাস ধরে পাথর উত্তোলন চলার পর পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
এছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে হলে বিভিন্ন তদবির করতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক উদ্যোক্তার দাবি, উপদেষ্টার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অনেক সময় অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।
বন অধিদপ্তরের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কিছু লাভজনক পদে নিয়োগ বা বদলির ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ ওঠে। একইভাবে সরকারি ক্রয় বিধি লঙ্ঘন করে কিছু প্রকল্পে টেন্ডার ছাড়াই কাজ দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, গবেষণার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কোনো গবেষণা হয়নি।
ইটভাটার লাইসেন্স প্রদান নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম হয়েছে এবং এ কারণে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। পর্যটন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের দাবি, এই সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দ্বীপটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই সব অভিযোগের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোচিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে এবং অভিযোগের বিষয়ে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: