সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ
ইসির অগ্নি পরীক্ষা, সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ
অপেক্ষার পালা শেষ। আজ বৃহস্পতিবার বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসংদ নির্বাচন ও গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যালট পেপারে টানা ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রে কেন্দ্রে গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে। সব কেন্দ্রের ভোটের হিসেব যোগ করে ঘোষণা করা হবে প্রতিটি সংসদীয় এলাকার ফলাফল। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য এ নির্বাচন অগ্নি পরীক্ষা। তীক্ষè দৃষ্টি রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের। তাই সহিংসতা ঠেকাতে সারাদেশে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে সক্রিয় যৌথবাহিনী। বডি-ওর্ন ক্যামেরায় করা হচ্ছে সার্বক্ষণিক লাইভ মনিটরিং। ৯০ ভাগ ভোট কেন্দ্র সিসিটিভির আওতায়। বহু আলোচনা-সমালোচনার পর শেষ পর্যন্ত কেমন ভোট হয় তা দেখতে সবার প্রত্যাশা। এদিকে এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা করায় ৫ লাখ প্রবাসী ভোট দিয়েছেন। এবার ভোটের ফলে ফ্যাক্টর হচ্ছে সাড়ে ৪ কোটি তরুণের ভোট।
ইসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এবারের নির্বাচনে ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। নির্বাচন কমিশনে মোট নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৬০টি। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত। বাকি দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি দল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে ওই আসনের জামায়াতের প্রার্থী নিহত হওয়ার কারণে। বাকি ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী আছেন ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে ৫০টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। এবার পুরুষ প্রার্থী ১ হাজার ৯৪৬ জন আর নারী প্রার্থী আছেন ৮১ জন।
এবারের নির্বাচনে সারাদেশে ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি। এর মধ্যে ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্র মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার ১৩টি আসনে রয়েছে এক হাজার ৪০০টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে বাড়তি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন ৬৯ জন। আর সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন ৫৯৮ জন। আর ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসারসহ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি সাদা ব্যালট পেপার এবং গণভোটের জন্য গোলাপি ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে। এসব ব্যালট পেপার ভোট শুরুর আগেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভাটকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ করতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সকল বাহিনীকে নিয়ে যৌথবাহিনী নিয়োগ করা হয়। এই যৌথবাহিনী নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারাদেশে দায়িত্ব পালন করছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ জন র্যাব সদস্য, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার সদস্য, ৩৭ হাজার ৫৫৩ জন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ১ লাখ ৩ হাজার সেনাবাহিনীর সদস্য, ৫ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য, ৩ হাজার ৫০০ বিমান বাহিনীর সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড ও ১ হাজার ৯২২ জন বিএনসিসি সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, বুধবারই ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়। দুর্গম অঞ্চলে ব্যালট পেপারও পৌঁছে দেয়া হয়। দুর্গম অঞ্চল ছাড়া অন্য সব কেন্দ্রে আজ সকালে ভোট শুরুর আগেই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ব্যালট পেপার। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের চাপ থাকায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য আজ অগ্নিপরীক্ষা। তাই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে ইসির নির্দেশে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অধিকতর তৎপর। সারাদেশের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের আশপাশে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ত্রিস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলার অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মাঠে থাকায় জনমনে স্বস্তি বিরাজ করছে। ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন নিবিড়ভাবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
শেরপুর-৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে ইসি। ফলে আজ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনে ভোট হচ্ছে। এদিকে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর ভোট প্রার্থনা অব্যাহত রাখলেও একেবারে শেষ দিকে এসে ক’জন নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। তবে ব্যালট পেপারে তাদের প্রতীকও থাকছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী বিএনপির ২৯১ জন (ধানের শীষ), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন (হাতপাখা), আর তৃতীয় সর্বোচ্চ জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন (দাঁড়িপাল্লা)। এ ছাড়া ১৯৮ জন জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল), গণঅধিকার পরিষদের ৯৪ জন (ট্রাক) ও ৩২ জন এনসিপির (শাপলা কলি) প্রার্থী রয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বুধবার থেকে ২ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। শুক্র ও শনি আরও দুইদিনসহ ৪ দিনের ছুটি পেয়ে এবার বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন নগর-মহানগর থেকে গ্রামের বাড়িতে ছুটে গেছে। ভোটকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। এবার ভোটের দিন সড়কপথে কার, মাইক্রো, পিকআপ ও মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবশ্য নির্বাচনী এলাকায় ইসির অনুমোদিত স্টিকার ব্যবহার করে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যান চলাচল করতে পারবে।
১১ ডিসেম্বর ঘোষিত ইসির তফসিল অনুসারে ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭ টায় নির্বাচনী প্রচার শেষ হয়। তারপরও প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা বিভিন্ন কৌশলে নীরব গণসংযোগ অব্যাহত রাখে, যা আজ ভোটগ্রহণ শুরুর আগ পর্যন্ত চলবে। তবে কোনো প্রার্থী বা তাদের পক্ষে যেন কেউ ভোটারদের কোনো ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ভোটে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে জন্য প্রতিটি এলাকায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। আজও ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।
ইসি সূত্র জানায়, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করাই চ্যালেঞ্জ। যদিও এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসির চেয়েও সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও কম নয়। তবে ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন সে জন্য বাস্তবমুখী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধিরও যথাযথ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব দল অংশ নেয়। এর ফলে ওই নির্বাচন ছিল জমজমাট। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। আর শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় বিএনপি ও জামায়াত। ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে আওয়ামী লীগ। এ কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, বিকল্পধারাসহ কিছু রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশ ক’টি দল না আসায় নির্বাচন জমজমাট হয়নি, হয় একতরফা। ওই নির্বাচনে প্রার্থী সংখ্যাও ছিল অনেক কম। এর মধ্যে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যে কারণে সে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয়পার্টিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অধিকাংশ দল অংশ নিলেও ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সার্বিক পরিবেশ প্রতিকূলে থাকায় ওই নির্বাচনকে সিরিয়াসলি নেয়নি। এ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে হওয়ার জোরালো অভিযোগ উত্থাপণ হওয়ায় ভোটের ফল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর পর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ অর্ধশতাধিক দল বর্জন করায় আওয়ামী লীগ তাদের সমমনা কিছু দলকে নিয়ে একতরফা নির্বাচন করে। ফলে এ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ এ নির্বাচনকে গ্রহণ করেনি। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে যেন কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করতে না পারে সে জন্য নির্বাচন কমিশন, সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তৎপর রয়েছে।
ইসির পক্ষ থেকে এবার ভোট কেন্দ্রে সকল প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নিশ্চিত করা, ভোটগ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এবার ভোট কেন্দ্রে সকল প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নিশ্চিত করা, ভোটগ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আচরণবিধি মানাতে ১ হাজার ৫১ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছেন ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন এবং ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক।
জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সভা। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই আইন সভার ৩০০ জন সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া ৫০ জন নারী সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনীত হন। দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের নাগরিকদের কাছে এ নির্বাচন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ সবাই চান তার পছন্দের মানুষটি নিজ সংসদীয় এলাকা থেকে সংসদ নির্বাচিত হোক। এ ছাড়া এবার গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হচ্ছে গণভোট।
উল্লেখ্য, দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি। ভোটগ্রহণ হয়েছিল ৭ মার্চ। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ২ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৮৬ সালের ২ মার্চ। ভোটগ্রহণ হয়েছিল একই বছরের ৭ মে। চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৮৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৯০ সালের ১৫ ডিসেম্বর। আর ভোটগ্রহণ হয়েছিল ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর। ভোটগ্রহণ হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। সপ্তম সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২৭ এপ্রিল। আর ভোটগ্রহণ হয়েছিল ওই বছর ১২ জুন। অষ্টম সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয়েছিল ২০০১ সালের ১৯ আগস্ট। আর ভোটগ্রহণ হয়েছিল ১ অক্টোবর। নবম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছিল ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর। ভোটগ্রহণ হয়েছিল ২৯ ডিসেম্বর। দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর। আর ভোটগ্রহণ হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল হয় ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর। আর ভোটগ্রহণ হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর। আর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর। ভোটগ্রহণ হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি।
পোস্টাল ভোট ॥ এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী, সরকারি কর্মচারী, ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আজ বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যেসব পোস্টাল ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছবে, সেগুলো গণনা করা হবে।
মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট ॥ নির্বাচন উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশের মোড়ে মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল চলছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। তল্লাশি করা হচ্ছে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের।
প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি ॥ দাগি ও চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, উগ্রবাদ ও নাশকতাকারী, অস্ত্রধারী, বোমা তৈরির কারিগরসহ নাশকতায় যুক্ত অপরাধীদের ধরতে গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি বৃদ্ধি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পর্যাপ্ত পরিমাণ ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও ভোটকেন্দ্রে এবং কেন্দ্রের বাইরে সন্দেহভাজন ভোটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও দায়িত্বরত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তাদেরও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে জেলা মনিটরিং অপারেশনস কমান্ড ও কন্ট্রোল রুম।
প্রথমবারের মতো ড্রোন ব্যবহার ॥ এবারই প্রথমবারের মতো ড্রোনের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ২০০টি, নৌ-বাহিনী ১৬টি, বিজিবি ১০০টি, বাংলাদেশ পুলিশ ৫০টি, কোস্টগার্ড ২০টি, র্যাব ১৬টি ও বাংলাদেশ আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১৬টি ড্রোন করা হচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন বাহিনী তাদের ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করছে।
ভোট কেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত থাকবে সেনাসদস্য ॥ ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাতায়াত ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবার প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেনাবাহিনীকে। সেনাবাহিনী সারাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায় ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল যৌথ অভিযান ও চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধী গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলমান রেখেছে বলে জানা যায়।
দুর্গম অঞ্চলের নিরাপত্তায় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ॥ নির্বাচনে প্রথমবার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। উপকূলীয় ও দুর্গম চরাঞ্চলে এলাকাগুলোর নিরাপত্তাসহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও দ্রুত পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
উপকূলীয় ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ॥ উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চল- ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার ও কোস্টগার্ডের তিন হাজার সদস্য নিরাপত্তায় কাজ করছে।
বিএনপির সিনিয়র নেতারা কে কোথায় ভোট দিচ্ছেন ॥ দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে এবার দলের নির্বাচনের সার্বিক দায়িত্ব পালন করছে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি এবার ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচন করছেন। আজ তিনি তার বাসার অনতিদূরে গুলশান-২ এর ৮৬ নম্বর সড়কের গুলশান মড়েল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করবেন। এ কেন্দ্রর বিপরীত পাশেই বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়।
এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। দলের স্থায়ী কমিটি সদস্যদের মধ্যে ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুমিল্লার দাউদকান্দি গয়েশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মির্জা আব্বাস রাজধানীর শাহাজাহানপুর মির্জা আব্বাস মহিলা ডিগ্রি কলেজে, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কেরানীগঞ্জের আরাকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ড. আব্দুল মঈন খান নরসিংদীর পলাশে চরনগরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের মুন্সীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সালাহউদ্দিন আহমদ কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা সরকারি মডেল জি এম সি ইনিস্টিউট, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জের সালেহা ইশহাক সরকারি গার্লস স্কুল, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম ভোলার লালমোহনে আব্দুল ওয়াহাব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের মতিহারা সরকারি হাইস্কুলে ভোট দেবেন।
জামায়াত নেতারা ভোট দিচ্ছেন যেখানে ॥ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজধানী ঢাকার মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় (বালক শাখা) ভোটকেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এ ছাড়া দলের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বালুয়াভাটা প্রফেসরপাড়া কেন্দ্রে, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিষালবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার পশ্চিম ডেকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ও মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার শিশুকল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এ ছাড়াও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার ৮ নম্বর পশ্চিম শিরোমণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম ঢাকার খিলগাঁও গোড়ানস্থ আলী আহমেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে, ড. হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তেলিয়াকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ও মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ডিগ্রিচর সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দেবেন।
এনসিপি নেতারা ভোট দিচ্ছেন যেখানে ॥ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রাজধানীর বাড্ডার বেরাইদ (ফকির খালি রোডের মাথা) এ কে এম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন। আর সদস্য সচিব আখতার হোসেন রংপুরের কাউনিয়ার ভায়েরহাট (টেপা মধুপুর) কেন্দ্রে, দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া রাজধানীর নিউমার্কেটের গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল কেন্দ্রে, দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লার দেবিদ্বারের রসুলপুর ইউনিয়নের গোপালনগর হাইস্কুল কেন্দ্রে ও উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড় বামনকুমার রাখালদেবীহাট হাইস্কুল কেন্দ্রে ভোট দেবেন। সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনের সদস্যগণ যেখানে ভোট দিচ্ছেন ॥ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এছাড়া নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর পুটিনা উচ্চবিদ্যালয়, আব্দুর রহমানেল মাছউদ উত্তরা আলোরধারা স্কুল কেন্দ্রে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ (অব.) বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও তাহমিদা আহমদ আজিমপুর অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন। আর ইসি সচিব আখতার আহমেদ ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ হাই স্কুল কেন্দ্রে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- সংসদনির্বাচন* গণভোট,আজ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: