আ.লীগের ঘাটিতে নীরব বিপ্লব জামায়াতের
ফরিদপুর-১ নির্বাচনী বিশ্লেষণ
আ.লীগের ঘাটিতে নীরব বিপ্লব জামায়াতের
মিজান উর রহমান, বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :
ফরিদপুর-১ আসনে নির্বাচন পরবর্তী বিশ্লেষণ।
আ.লীগের ঘাটতি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে জামায়াত। জামায়াতের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে অনুপ্রাণিত জামায়াতের নেতা-কর্মীরা।
বোয়ালমারী, মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ আসন।
সদ্য সম্পন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো জয়লাভ করলেন জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা এই আসন থেকে। অতীতের ১২টি
জাতীয় নির্বাচন ও একটি উপনির্বাচনের মধ্যে ৯টি নির্বাচনেই এই আসনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারে নাই দলটি। দলীয় নির্দেশনা ভিন্ন থাকলেও তাদের বিপুল সংখ্যক সমর্থক গত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছেন। এর পাশাপাশি দলীয় কোন্দলের কারণে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলাম হেরেছেন ২৬ হাজার ১৯৭ ভোটের ব্যবধানে।
তিন উপজেলায় এবারের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৫ লাখ ৫ হাজার ৭০৩ জন। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট পড়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৩ ব্যক্তি ভোট দিয়েছেন দাঁড়িপাল্লায়। এতে করেই জিতে গেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮৬ ভোট।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আলফাডাঙ্গা উপজেলায় বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে দ্বিগুণ ভোট পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। এ উপজেলায় ধানের শীষ যেখানে পেয়েছে ১৪ হাজার ২৪১ ভোট, সেখানে দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ২৮ হাজার ৯৭৩ ভোট। মধুখালীতে জামায়াত পেয়েছে ৫৪ হাজার ৫৭৬ ভোট, বিএনপির ঝুলিতে গেছে ৫২ হাজার ৯১৪টি। বোয়ালমারীতে জামায়াত ৬৮ হাজার ৪৩৪টি ও বিএনপি ৫৮ হাজার ৬৩১ ভোট পেয়েছে। নিজ উপজেলাতেও বিএনপি প্রার্থী হেরেছেন।
তিন উপজেলার প্রদত্ত ভোটের মধ্যে আলফাডাঙ্গায় দাঁড়িপাল্লা ধানের শীষের চেয়ে ভোট পেয়েছে ১৪ হাজার ৭৩২টি বেশি। অথচ মধুখালীতে এই ব্যবধান মাত্র ১ হাজার ৬৬২। বোয়ালমারীতে জামায়াত বেশি পেয়েছে ৯ হাজার ৮০৩ ভোট। এখানে দলটির বিজয়ে অনেকে অবাক হলেও বিষয়টি অবিশ্বাস্য নয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলীয় কোন্দলসহ নানা কারণেই এখানে বিপর্যস্ত ছিল বিএনপি, যার ফল এসেছে নির্বাচনে।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ফরিদপুর-১ আসনে জামায়াতের জয় ও বিএনপির বিপর্যয়ের কারণ খুঁজেছে সংবাদকর্মীরা। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে তিন উপজেলায় বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে বিভেদ চরমে পৌঁছে। পক্ষে-বিপক্ষে চলতে থাকে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিলসহ নানা কর্মসূচি। মধুখালী কিছুটা শান্ত থাকলেও বিএনপিতে বোয়ালমারী এবং আলফাডাঙ্গার গ্রুপিং শক্ত অবস্থানে চলে যায়। এ নিয়ে কোন্দল, নেতাকর্মীদের বহিষ্কার, প্রার্থীর নামে অপপ্রচার, অপবাদ, নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস সর্বপরি নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে বিএনপির কতগুলো অসতর্ক সিদ্ধান্ত কাল হয়ে দাড়ায় খোন্দকার নাসিরুল ইসলামের জন্য। নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে বিএনপির তিন নেতার বহিষ্কারাদেশ সর্বনাশের শেষ প্রান্তে পৌঁছে দেয়। কয়েকটি গণমাধ্যম এ পরাজয়ে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করলেও মুলত: অন্ত:কোন্দলই ছিলো পরাজয়ের মুল কারণ। এটাই সংশ্লিষ্টদের ধারনা।
পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও নিরীহ মানুষের নামে মামলা দিয়ে হয়রানি, চৌরাস্তায় স্মৃতি সৌধ ভাংচুর এই আসনের ফলাফলে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে বৈকি। পাশাপাশি হামলা, চাঁদাবাজি, কিছু কর্মী-সমর্থকের হুমকি-ধমকি, বাড়াবাড়ির কারণেই হেরেছেন বিএনপি প্রার্থী এমন মন্তব্যও করেছেন অনেকে। তবে নির্বাচনের দুই দিন আগে ‘নাসির ঠেকাও’ স্লোগানও শুরু হয়েছিল তিন উপজেলায় বিএনপির বহিস্কৃত গ্রুপ থেকে; যার ফল দেখা গেছে ভোটে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, তাঁর ও কর্মীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম, সুদক্ষ-প্রশিক্ষিত মহিলা কর্মীদের দীর্ঘদিনের মাঠে নেমে নানা কায়দায় ভোট প্রার্থণা, ধর্মীয় প্রচারণা, বারবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা তাদের বিজয়ে ভূমিকা রেখেছে। সেটি নিশ্চিত করেছে বিএনপির একাংশের ভোট ও বিএনপির কাছে নিপীড়ন-হয়রানির শিকার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকের ভোট।
জামায়াতের একটা কৌশল খুবই কাজে লেগেছে; ৫% ভোটার 'আ.লীগ দেখেছি, বিএনপি দেখেছি, জাতীয় পার্টিকে দেখেছি এবার জামায়াতকে দেখবো' এই স্লোগানে আসক্ত হয়ে সারা দেশে জামায়াত প্রার্থীদের ভোট দিয়েছে।
খোন্দকার নাসিরের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধারা জোট বদ্ধ হয়ে ভোট দিয়েছেন। কোন আওয়ামী শীর্ষ নেতা তাঁদেরকে কোন প্রকার নিষেধ করেন নাই ভোট দানে বিরত থাকতে। এমনটি জানালেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা । এই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাবী, খোন্দকার নাসিরের স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে। তাই তাঁরা সবাই ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। তিনি দাবী করেন, খোন্দকার নাসিরের পরাজয়ের মুল কারণ দলের বিভক্তি এবং নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে তিন নেতাকে বহিষ্কার করা। যা গোটা নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
এক মামলা, বড় দায়
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি আলফাডাঙ্গা থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা হয়। মামলাটির বাদী পৌর সদরের বাসিন্দা ও বিএনপি সমর্থক লাভলু সর্দার। পেশায় দিনমজুর এই ব্যক্তি মামলার বিষয়ে তেমন কিছু জানতেনও না। এতে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতাসহ ১৭০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করা হয়ে আড়াই থেকে তিন হাজার ব্যক্তিকে। মামলাটিতে দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী ও সমর্থককে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অনেকে এখনও এলাকা ছাড়া।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের সমর্থক আলফাডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির দুই নেতা লাভলু সর্দারকে দিয়ে মামলা করান। পরে তারা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট লোকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ও হয়রানি করেন। এতে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা নির্বাচনে সরাসরি বিএনপি প্রার্থীর বিরোধিতা করেন। এতে আলফাডাঙ্গায় খন্দকার নাসিরুলের ভরাডুবি হয়েছে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা।
আলফাডাঙ্গা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও আমাদেরহ আলফাডাঙ্গার সম্পাদক শেখ সেকেন্দার আলম বলেন, মামলার কারণে আলফাডাঙ্গাবাসীর ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। তা ছাড়া বিএনপি আর আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে বেগার খেটে দিয়েছে। জামায়াতের কর্মীরা বারবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চেয়েছে। ধর্মের বিষয়ে ভোটারদের দুর্বল করেছে। ভোটাররাও নীরবে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। পক্ষান্তরে বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠে নামেনি, কারও কাছে ভোটও চাননি। তাদের বেশি আত্মবিশ্বাস ছিল, যা বুমেরাং হয়েছে। শেষ মুহূর্তে এসে ভোট ঘুরে যায়। বিএনপির একাংশের স্লোগান ছিল, ‘খন্দকার নাসিরকে ঠেকাও’। আর তাঁকে ঠেকাতে হলে ভোট দাঁড়িপাল্লায় দিতে হবে। ফলাফলে সেই প্রভাবই পড়েছে। আবার বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার কিছু প্রভাবশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল বাসার খাঁনকে সমর্থন করলেও দিন শেষে ভোট দিয়েছেন দাঁড়িপাল্লায়।
আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার ভাষ্য, খন্দকার নাসিরের দুই সমর্থক মিথ্যা মামলা দিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করেছে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কারাবন্দি ও পলাতক নেতাকর্মী এবং তাদের আত্মীয়স্বজন নাসিরকে ঠেকাতে জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন। যে হারে চাঁদাবাজি করা হয়েছে, মানুষ বিএনপির প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীরা ভোটারদের কাছে ভোটও চাননি। অপরদিকে জামায়াতের কর্মীরা, বিশেষ করে নারীকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চেয়েছেন।
বিএনপি কর্মীদের বাড়াবাড়ি
আর্থসামাজিক প্রতিষ্ঠান সোসাইটি ডেভেলপমেন্ট কমিটির (এসডিসি) পরিচালক কাজী হাসান ফিরোজ বলেন, বিএনপির প্রার্থীর নামে নানাভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। নানারকম অপবাদ দেওয়া হয়েছে। এ সকল অপপ্রচার ও অপবাদ নাসিরুল ইসলামের ভোট কমিয়েছে। তা ছাড়া ৫ আগস্টের পর তিন উপজেলার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা হয়েছে, মামলা দিয়ে হয়রানি ও চাঁদাবাজি করা হয়েছে। এ কারণে অনেক আওয়ামী লীগের লোক তাঁকে ভোট দেননি। তাঁর কিছু কর্মী-সমর্থকের বাড়াবাড়ি ছিল, যা পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী শাহিদুজ্জামান লিটন বলেন, তিনটি উপজেলায়ই বিএনপি বিভক্ত ছিল। দলের একটি অংশ বিএনপির প্রার্থীকে হারাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। প্রার্থীর পক্ষের বিএনপির কর্মীরা আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি। জামায়াতের কর্মীরা অধিকতর ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ বিশেষ করে মহিলা কর্মীরা।
জামায়াত প্রার্থীর তুলনামূলক ক্লিন ইমেজও তাঁর জয়ে ভূমিকা রেখেছে।
এসব বিষয়ে নির্বাচনের আগে বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি শামসুদ্দিন মিয়া ঝুনু বলেন, ‘আমরা ছাত্রদল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা দিয়ে বিএনপিতে এসেছি। আমরাই অরিজিনাল বিএনপি, অথচ আজ আমরা বিএনপিতে অপাঙক্তেয়! ভুল সিদ্ধান্তে আমাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে তিন উপজেলার কমিটি থেকেও আমাদের বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদের দোসরদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।’ তিনি মনে করেন, দলীয় প্রার্থী সঠিক ছিল না। আর নির্বাচনে বিএনপি হারেনি, হারের এ দায় ব্যক্তি নাসিরের।
পরাজয়ের কারণ বিষয়ে খন্দকার নাসিরুল ইসলামের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের ভোট পেয়েই জামায়াত জিতেছে।
অবশ্য জামায়াতকে ঠেকাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন সারি বেঁধে তাঁকেই ভোট দিয়েছেন জানিয়ে খন্দকার নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারবো না।’ তিনি স্বীকার করেন, দলের কিছু লোক বিএনপির বদলে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ভোট তিনি পাননি।
দৈনিক পুনরুত্থান / মিজান উর রহমান
- বিষয়:
- আ.লীগের*ঘাটিতে,নীরব
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: