রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে উত্তাপ, দিশেহারা মানুষ
নুর-আমিন,খানসামা,দিনাজপুর,প্রতিনিধি :
পবিত্র রমজান মাস এলেই যেন বাজারে অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে। সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির এই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সকালে ১১টায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দিনাজপুরের খানসামাসহ আশপাশের বাজারগুলোতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে ভোজ্যতেলের বাজার। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০০ টাকায়। বোতলজাত তেলের দামও বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা। ছোলার কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৮ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। খেজুরের বাজারে অস্থিরতা আরও প্রকট—মানভেদে ২৪০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকানো হচ্ছে। ইফতারের সুন্নতি এই খাদ্য এখন অনেক নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।
ফলমূলের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি চোখে পড়ার মতো। আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৮০ থেকে ৩৪০ টাকায়, কমলা ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা, মালটা ৩২০ টাকা। আঙ্গুরের দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। পেয়ারার কেজি ১৩০ টাকা, কলা প্রতি হালি ৫০ টাকা। আর লেবুর দাম হালিপ্রতি ৬০ টাকা—যা কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে।
সবজির বাজারেও স্বস্তির খবর নেই। যদিও আলু কেজিতে ১৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, তবে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে। রসুন ১৪০ টাকা, শসা ৮০, বেগুন ৮০, টমেটো ৪০ টাকা কেজি। পেঁয়াজ ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০, বাঁধাকপি ৩০ ও গাজর ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
শাকসবজির দামও কম নয়—নাফা শাক ও পালং শাক প্রতি আঁটি ১০ টাকা, লাউ শাক ২০ টাকা।
মাংসের বাজারে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশি মুরগির কেজি ৫০০ টাকা, পাকিস্তানি ও লেয়ার মুরগি ৩০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি গোটা ১৯০ টাকা এবং কাটা ২৫০ টাকা। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭০০ টাকায়। এসব দামে নিম্নআয়ের ও দিনমজুর পরিবারগুলোর জন্য প্রোটিনের যোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজানকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকির অভাবেই এমন অস্থিরতা বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা।
আহাত আলী নামে এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রমজানে শয়তান বন্দি থাকলেও কিছু ব্যবসায়ীর মনের শয়তানি বন্ধ হয় না। এই দামে সংসার চালানোই মুশকিল।”
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।
পাকেরহাট বাজারের সবজি বিক্রেতা শামীম খন্দকার বলেন, “বর্তমানে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় দাম বাড়ছে। সব খরচ বাদ দিয়ে খুব সামান্য লাভেই বিক্রি করছি।”
এ বিষয়ে খানসামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “রমজানকে কেন্দ্র করে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। ইতোমধ্যে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে বা অতিরিক্ত মুনাফা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও জানান, বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত অভিযান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতন থাকার আহ্বানও জানান তিনি।
তবে সাধারণ ক্রেতাদের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই অভিযান কতটা কার্যকর হবে? বাজারের দামের এই আগুন কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণে আসবে?
দৈনিক পুনরুত্থান / নুর-আমিন
- বিষয়:
- রমজানে* নিত্যপণ্যের,বাজারে
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: