• ঢাকা
  • শনিবার, ২১ ফেরুয়ারী ২০২৬, ৯ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

ইতিহাসের আড়ালে থাকা এক বীর, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় শহীদ আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শনিবার, ২১ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৪৯ পিএম;
ইতিহাসের আড়ালে থাকা এক বীর, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় শহীদ আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ

বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধারণ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে দেশ গঠনের জন্য যারা আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তাদের মধ্যে আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ ছিলেন অন্যতম বীরসেনানী।

১৯০৭ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুরের ঐতিহ্যবাহী মিঞাবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ। ১৯৫০ সালের ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি আগরপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারীরা হিন্দুদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। তখন আগরপুর ইউনিয়নে প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। 

তাদের রক্ষায় আগরপুরের এ দাঙ্গার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন আগরপুর ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ। তিনি তার এলাকার হিন্দুদের রক্ষা করতে নিজ বাড়িতে ও শোভাকাঙ্খীদের কাছে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি কিছুসংখ্যক গ্রামবাসীদের নিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধে অবতীর্ণ হন এবং নিজেই বন্দুক হাতে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রহরায় নিযুক্ত হন।

১৯৫০ সালে ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি আগরপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারীরা দল বেঁধে আক্রমণ করতে আসে। একপর্যায়ে তারা (দাঙ্গাকারী) হিন্দুদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। তখন দাঙ্গাকারীদের রুখতে এবং হিন্দুদের রক্ষার জন্য অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ আলতাফ উদ্দিন তার নিজস্ব বন্দুক দিয়ে দাঙ্গাকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন।

গুলিতে সেদিন দুইজন দাঙ্গাকারী মারা যায়। একপর্যায়ে আলতাফ উদ্দিনের ব্যবহৃত বন্দুকের গুলি শেষ হওয়ায় দাঙ্গাকারীরা আলতাফ উদ্দিনের উপর চড়াও হয়ে দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে বল্লম ছোড়ে। আলতাফ উদ্দিন তাতে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে পরে গেলে দাঙ্গাকারীরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারোধ করতে গিয়ে শহীদ হন মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও বীরসেনানী আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ।

তাঁর আত্মাহুতির পর দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে সেদিন গ্রামবাসী ঝাঁপিয়ে পরেন। পরেরদিন বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ওই গ্রামে এসে দাঙ্গা দমন করতে থেকে যায়। আলতাফ উদ্দিনের আত্মত্যাগের ফলে সেদিন বহু প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল।

পরবর্তীতে তার স্মৃতি রক্ষার্থে আগরপুরে আলতাফ উদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত মডেল একাডেমীর নাম পরিবর্তন করে "শহীদ আলতাফ উদ্দিন মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউশন" করা হয়।

বরিশালের ইতিহাসবিদ সিরাজ উদ্দীন আহমদ বলেন, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধারণ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে দেশ গঠনের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তাদের মধ্যে আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ ছিলেন অন্যতম বীরসেনানী। তাই শহীদ আলতাফ উদ্দিনকে রাষ্ট্রীভাবে স্বীকৃতি দিতে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

কবি ও সাহিত্যিক শিকদার রেজাউল করিম বলেন, শহীদ আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলে বাংলাদেশের মানুষ তার সম্পর্কে জানবে এবং ইতিহাসকে ধারণ করে আগামীদিনে আলতাফ উদ্দিনের মতো সাহসী ভূমিকা রাখবে। 

উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের প্রেস নোট অনুসারে দুইজন অজ্ঞাত পরিচয়ের যুবক ১৯৫০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুর হতে উত্তেজনাপূর্ণ গুজব ছড়াতে শুরু করে বরিশাল শহরজুড়ে। ফলে বরিশালের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

আরও একটি গুজব ছড়ানো হয় যে, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও তার ভগ্নিপতিকে কোলকাতায় খুন করা হয়েছে। এ গুজবের পর সন্ধ্যা নেমে আসতেই কমপক্ষে আট জায়গায় অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি ত্রিশটি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে সম্পূূর্ণ ভস্মিভূত করে দেওয়া হয় এবং কমপক্ষে দশজন আগুনে দগ্ধ হয়।

নির্যাতনের বীভৎসতা সহ্য করতে না পেরে বরিশালের নৌ-বন্দর এলাকা মুলাদী পুলিশ স্টেশনে শত শত হিন্দু এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু নিজেদের এলাকা থেকে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয়া হতভাগ্য হিন্দুদেরকে পুলিশ স্টেশন কম্পাউন্ডের মধ্যেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। ওই ঘটনাটি মুলাদী হত্যাকান্ড নামে পরিচিত।

এছাড়াও বাবুগঞ্জের মাধবপাশা গ্রামে প্রায় তিনশ' হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে ধাওয়া করে আটকের পর দাঙ্গাকারীরা তাদেরকে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাম দা দিয়ে মাথা কেটে নেয়। মাধবপাশা জমিদার বাড়ীতে দুইশ' হিন্দু লোককে হত্যা করা হয়।

বরিশালে সে সময় বেশ কয়েক হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যা করা হয়েছিলো। এছাড়াও কয়েক লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের নর-নারী বরিশাল থেকে ভারতে পালিয়ে যায় এবং ওই শরণার্থীরা তাদের যাত্রা পথেও হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও লুটপাটের শিকার হয়েছিলেন। 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন