• ঢাকা
  • রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. আর্ন্তজাতিক

হামলার শঙ্কায় নির্ঘুম রাত


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: রবিবার, ০৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:০৬ এএম;
হামলার শঙ্কায় নির্ঘুম রাত
মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ

হামলার শঙ্কায় নির্ঘুম রাত

  • ইরান কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করবে না : মাসউদ পেজেশকিয়ান
  • ৩০ কোটি ডলারের রাডার উড়িয়ে দিয়েছে ইরান
  • বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা

ক্ষেপণাস্ত্রের বুক হিম করা বিকট শব্দে এখন মধ্যপ্রাচ্যবাসীর প্রতি মুহূর্ত কাটছে নাম না জানা শঙ্কায়। দিগন্ত কাঁপিয়ে আকাশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রজন্মের জঙ্গিবিমান। অনেকটা নিঃশব্দে লক্ষ্যপানে ছুটে চলছে হরেক মডেলের প্রাণঘাতী ড্রোন। বুলেটের প্রাণহীন সিসা কখন কার প্রাণ কাড়ে, সেটাও কেউ জানে না।

কেউ প্রাণ হারায় ঘরে কেউ বা আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউ বা রাস্তায়। এটাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিত্যদিনের দিনলিপি। বিশেষ করে গতকাল শনিবার মার্কিন মিত্রদের ভয়াবহ তাণ্ডবের ফলে যে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি বৈশ্বিক গণমাধ্যমেও বেশ ফোকাস হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আশঙ্কা করেছেন, ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শনিবার ইরানে ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান কারো হুমকির কাছে মাথা নত করবে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান নতুন নতুন মার্কিন সামরিক স্থাপনা খুঁজছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পণ্যবাহী জাহাজের জন্য কার্যত নিষিদ্ধ রয়েছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি শাসনের লাগাম টানতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েই চলেছেন। তাঁর কড়া ধমকে চুপসে গিয়ে ইউরোপের প্রথম সারির দেশগুলো মিত্রতার দোহাই দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একে একে জড়ো করছে সামরিক সম্পদ। অবশ্য ধ্বংসযজ্ঞে মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে অসম সাহসী ইরানও। প্রতি মুহূর্তে রক্ত ঝরছে, লাশের স্তূপ বাড়ছে, বাড়ছে শতাব্দী কাঁপানো হাহাকার।

মানুষের তাজা রক্তে লেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ইতিহাস। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, ইরান নতুন দফার হামলায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ২৫তম দফার হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে দেশটি। আইআরজিসি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সামরিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। এই অভিযানে হাইপারসনিক ফাতাহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক এমাদ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। ঘণ্টায় এর গতি ছয় হাজার ১৭৪ কিলোমিটার।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গতকাল শনিবার ভোর থেকে থেমে থেমে ইরানের তেহরান আর ইস্পাহানে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে। এরই মাঝে ইরানও একটি ঈর্ষণীয় সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে। কয়েক দিন আগে কাতারে ১.১ বিলিয়ন ডলার দামের মার্কিন রাডার ধ্বংসের পর জর্দানে এবার ৩০০ মিলিয়ন ডলার দামের আরেকটি রাডার ধ্বংসের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে ইরান। মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান। এই রাডারটি ধ্বংস হওয়ায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মার্কিন এক কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিগুলো দেখাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে জর্দানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি আরটিএক্স করপোরেশনের এন/টিপিওয়াই-২ রাডার এবং এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তাও থাডের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্রের উপপরিচালক রায়ান ব্রবস্ট বলেন, ‘যদি ধ্বংসের বিষয়টি সত্যি হয়ে থাকে, তবে থাড রাডারের ওপর এই হামলা হবে ইরানের অন্যতম সফল আক্রমণ।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সেন্সরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এর আগে কাতারে অবস্থিত ১.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এএন/এফপিএস-১৩২ আর্লি ওয়ার্নিং রাডারটিও ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ছাড়া বাহরাইনে মার্কিন স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন টার্মিনালগুলোতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে জর্দান, কাতার ও বাহরাইনের এই হামলাগুলো মার্কিন নজরদারি ব্যবস্থাকে অন্ধ করে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার এই ক্ষয়ক্ষতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কিন্তু প্যাট্রিয়ট সিস্টেমে ব্যবহৃত পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ এরই মধ্যে কমে এসেছে।

ইরান কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করবে না : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, আগ্রাসনের মুখে ইরান কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না। শত্রুদের ইরানি জাতির আত্মসমর্পণ দেখার যেকোনো আশা ত্যাগ করা উচিত। তেহরান থেকে সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ জানায়, গতকাল সন্ধ্যায় প্রচারিত জনসাধারণের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইরানের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের মুখোমুখি হওয়ায় বিদ্যমান সব পার্থক্য দূরে সরিয়ে রাখার আহবান জানিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যের আহবান জানিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, সবাইকে তাদের ভূমি ও মাতৃভূমিকে শক্তির সঙ্গে রক্ষা করার জন্য একত্র হতে হবে। তিনি বর্তমান সংকট থেকে মর্যাদার সঙ্গে বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের যেকোনো ধারণাই এমন একটি স্বপ্ন যা ইরানের শত্রুদের অবশ্যই কবর দিতে হবে।

তিনি আন্তর্জাতিক আইন এবং মৌলিক মানবিক নীতির প্রতি ইরানের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, সকল জাতিরই এগুলোকে সম্মান করা উচিত।

পেজেশকিয়ান ইরানের আক্রমণের শিকার প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, শত্রুদের নৃশংস আগ্রাসনে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পাশাপাশি অনেক সামরিক কমান্ডার এবং সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছেন। যখন কমান্ডাররা অনুপস্থিত থাকেন তখন সাহসী সশস্ত্র বাহিনী সম্মানের সঙ্গে মাতৃভূমি রক্ষার জন্য সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করে। পেজেশকিয়ান আরো বলেন, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করার কোনো ইচ্ছা নেই। তারা ভাই হিসেবে বিবেচিত। তিনি এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতাবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার আহবান জানান। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের গুরুত্বের ওপরও জোর দেন তিনি।

তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা ইরানের : এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘প্রিমা’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)। আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ এবং পরিস্থিতি অনিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও নৌবাহিনীর বারবার দেওয়া সতর্ক বার্তা উপেক্ষা করায় ট্যাংকারটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সকালে আইন লঙ্ঘনকারী ট্যাংকারটির ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে। মেরিন ট্রাফিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রিমা একটি তেল ও রাসায়নিক পদার্থ বহনকারী ট্যাংকার, যা মাল্টার পতাকাবাহী হিসেবে নিবন্ধিত।

আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে হামলা ইরানের : সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিশানা করে গতকাল অন্তত ১৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২১টি ড্রোন হামলা করা হয়েছে। একটি বিমানঘাঁটিতে গতকাল হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হামলায় একটি মার্কিন স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র, সতর্কীকরণ ও ফায়ার কন্ট্রোল রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা : বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বাহরাইনে জুফায়র ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।

আইআরজিসি বলেছে, কেশমের একটি পানির প্লান্টের ওপর মার্কিন হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এর আগে বলেছিলেন, ওই মার্কিন হামলা ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করেছে।

সূত্র : সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা

 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন