• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

মায়ের চিরসান্নিধ্যে ফিরলেন ক্ষণজন্মা, কীর্তিমান


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৫০ পিএম;
মায়ের চিরসান্নিধ্যে ফিরলেন ক্ষণজন্মা, কীর্তিমান

ফাতেমা খানমের খুব আদরের সন্তান ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। জীবনের ব্যস্ততা, রাজনীতির উত্তাল দিন, আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়—সব কিছুর মাঝেও মা ছিলেন পরম নির্ভরতার স্থল, প্রেরণার উৎস।

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের রূপকারদের অন্যতম তোফায়েল আহমেদ মাকে নিয়ে ২০১৮ সালে এক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, “মা এবং মাতৃভূমি আমাদের কাছে সমার্থক। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণরত সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, আমরা জানি না। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ সেদিনের সেই শপথও আমরা জীবনবাজি রেখে বাস্তবায়ন করে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করেছি।

যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে আমি ও রাজ্জাক (প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক) ভাই ১৮ ডিসেম্বর এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ ২২ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করি। আর ২৮ ডিসেম্বর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে অবস্থানরত আমার পরম শ্রদ্ধেয় জননীর কোলে ফিরে যাই।”

দ্বীপ জেলা ভোলার সন্তান তোফায়েল আহমেদ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে পৌঁছেও মাতৃস্নেহের কাঙাল থেকেছেন। জেলগেট থেকে শুরু করে মন্ত্রিপাড়া কোথায় নেই মা।

তোফায়েল আহমেদ স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বমোট সাতবার আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি জায়গায় আমার বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছেন। সে কী কষ্ট! জেলগেটে যখন মা আমার সঙ্গে দেখা করতেন, সর্বক্ষণ আমার মাথাটা মায়ের বুকে থাকত। তারপর যখন তিনি আমাকে রেখে বিদায় নিতেন, তখন তার দুই চোখে অশ্রুর নদী। দুই ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, এক ছেলে কারান্তরালে। কী নিঃস্ব-রিক্ত আমার মা!’ 

দেশের মন্ত্রী হওয়ার পরেও মায়ের কাছে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আদরের সেই ছোট্ট ‘মনু’।

তিনি লিখেছেন, “সুখে-দুঃখে মা আমায় ছায়া দিতেন বটবৃক্ষের মতো। ’৯৬-এ সরকার গঠনের পর আমি তখন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বেইলি রোডে অবস্থিত বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গেই থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে তবেই দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর যে বাসায় এখন থাকি, এই বাসায় আমার শয়নকক্ষের পাশেই মায়ের ঘর। সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন, আদর ছিল নিত্যদিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম। আমি না ফেরা পর্যন্ত মা জানালার কাছে হাতে তসবিহ নিয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন কখন ফিরি। ঘরে প্রবেশ করেই মাকে চুমু দিয়ে রুমে যেতাম।”

 

মমতাময়ী মাকে হারানোর বেদনা আমৃত্যু বহন করেছেন তোফায়েল আহমেদ। ফাতেমা খানমের কবর-ফলকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি উৎকীর্ণ করে লিখেছিলেন—
‘মা, বাবা চলে গেছেন অনেক আগে
চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তোমারই পাশে
তুমিও চলে গেলে আমাদের 
সকলকে কাঁদিয়ে,
তবু তোমরা আছ সর্বক্ষণ
আমাদের হৃদয়জুড়ে।
মা, প্রতি মুহূর্ত তোমাদের অভাব
অনুভব করি। 
তোমার মনু (তোফায়েল)’                                                                

৮২ বছরের জীবন শেষে আবার মায়ের সান্নিধ্যে ফিরলেন জাতির সূর্যসন্তান। এ যেন দ্বিতীয়বার এবং চিরস্থায়ী ফিরে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মাথা উঁচিয়ে জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর। এর ছয় দিন পর ২৮ ডিসেম্বর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে ফেরেন জননীর বুকে।

এবার ৫৪ বছর ৫ মাস ৫ দিন পর ফাতেমা খানমের কাছে চিরদিনের জন্য ফিরে গেলেন তার আদরের ‘মনু’। অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মা-বাবার কবরের পাশে চিরশায়িত হলেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম রূপকার তোফায়েল আহমেদ। 

জীবন সমাপ্তিতে যেন পূর্ণতা পেল হারিয়ে যাওয়া মায়ের কাছে সন্তানের ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যে মানুষটি সারা জীবন ভালোবেসেছেন দেশমাতৃকাকে, ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেছেন, তিনি শেষ আশ্রয়ও নিলেন শিকড়ের কাছেই—মায়ের পাশে।

তোফায়েল আহমেদের মরদেহ মঙ্গলবার ভোলায় নেওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ চোখের পানিতে জানায় শেষ বিদায়। দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’। 

এরপর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে মা-বাবা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চির শায়িত হন ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্র।

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন সময়কে বদলে দিতে। তাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও কীর্তি হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই এক ক্ষণজন্মা, কীর্তিমান মানুষ। তার প্রস্থান একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অমোচনীয় নাম।

 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন