• ঢাকা
  • সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

অভিযানে পুলিশ পাঠিয়ে নিজ বাসভবনে মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ওসির বৈঠক!


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:৩৫ এএম;
অভিযানে পুলিশ পাঠিয়ে নিজ বাসভবনে মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ওসির বৈঠক!

ভারের কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারে একদিকে পুলিশ পাঠিয়ে অন্যদিকে গোপনে তার সঙ্গেই নিজ বাসভবনে বৈঠক করেছিলেন সাভার মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলি। আসামি হয়েও খোদ থানা কমপ্লেক্সেই ওসির বাসভবনে রাত ২টার পর চলে দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক।

ওসির ফরমায়েশ অনুযায়ী থানায় নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করা হতো। তিনি নিজেও নিয়মিত সেবন করতেন ইয়াবা। এনটিভি অনলাইনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
উল্লেখ্য, গত ২২ মে সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তায়েফুর রহমান তুহিন ও এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন। এ ছাড়া হামলায় দেশ টিভির ক্যামেরাপারসন কাইয়ুম ও গাড়িচালক জয়নাল আহত হন। ভাঙচুর করা হয় তাদের সঙ্গে থাকা দেশ টেলিভিশনের গাড়ি। লুট করা হয় ক্যামেরা।

হামলার ঘটনায় ওই দিন রাতেই শামীমকে প্রধান আসামি করে ২১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় ৪০-৫০ জনের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন দেশ টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই) মো. ফখরুল ইসলাম মজুমদার। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপ দাবি করেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঘটনার চার দিনের মাথায় গত ২৬ মে সাভার মডেল থানা থেকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলিকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর প্রায় মাসখানেক সাভার মডেল থানার ওসির পদটি শূন্য।

এর আগে শামীম রেজার সঙ্গে সখ্য ও যোগাযোগ থাকার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয় সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মনিরুজ্জামান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশিফুর রহমান ও মেরাজুল ইসলামকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুন সাভার মডেল থানা থেকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয় পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনকেও।

একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাভার মডেল থানা থেকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্য কারণ খুঁজতে শুরু হয় এনটিভির অনুসন্ধান। বেরিয়ে আসে মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার মাদক সেবন, মাসোহারা আদায়, গভীর সখ্যতা ও নিবিড় যোগাযোগের তথ্য।
শামীমের মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন করেন এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন।। এরপর র‌্যাবের পক্ষ থেকে শামীমের আস্তানায় চালানো হয় অভিযান। সেসময় শামীমকে না পেলেও শামীমের আস্তানা সংলগ্ন এলাকা থেকে তিনজনকে মাদক ও বিদেশি পিস্তলসহ আটক করে র‌্যাব। এরপর শামীমকে নিয়ে ফের প্রতিবেদন করলে সাদ্দামের ওপর তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয় শামীম সিন্ডিকেটের।

গত ২২ মে এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেনের সহযোগিতা নিয়ে সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করে গিয়ে সাদ্দাম হোসেন ছাড়াও হামলার শিকার হন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তায়েফুর রহমান তুহিন, ক্যামেরাপারসন কাইয়ুম ও গাড়িচালক জয়নাল। ওই ঘটনায় ওসি আরমান আলি স্বয়ং ঘটনাস্থল থেকে সাংবাদিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ (ক্র্যাব) বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের আলটিমেটামে চাপে পড়ে পুলিশ।

ওই রাতেই মামলার পর গণমাধ্যমের সামনে যেকোনো মূল্যে শামীম রেজা ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন সাভার মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলি।

মামলার পরও শামীম রেজা গভীর রাতে সাভার থানা কম্পাউন্ড অতিক্রম করে যান ওসির বাসভবনে। সেখানে ঘণ্টা দেড়েক অবস্থানের পর লাপাত্তা হয়ে যান তিনি।

এদিকে শামীম রেজা ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু শামীম মোবাইল ফোন ব্যবহার না করায় তার অবস্থান শনাক্ত করতে গলদঘর্ম হতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।

মাদক ব্যবসা ছাড়াও পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র মামলা, ভুয়া পুলিশ সেজে ডাকাতিসহ ১১টি মামলা রয়েছে শামীম রেজার বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে ২৬ মে এ ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতা সম্পর্কে গণমাধ্যমকর্মীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রশ্ন করলে নড়াচড়ে বসে পুলিশ সদর দপ্তর। ওই দিনই প্রত্যাহার করা হয় সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলিকে।

এদিকে শামীমকে গ্রেপ্তারে অভিযানের বিষয়টি নিজেই তদারকি করেন  ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন। এরপর শামীম রেজার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছাড়াও তৃতীয় চতুর্থ স্তরের সহযোগীদের ওপর নজরদারি শুরু হয় পুলিশের।

জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে শামীম রেজা চতুর্থ পর্যায়ের একজন সহযোগী কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিলে তাকে অনুসরণ করে পুলিশ। বিভিন্ন হোটেলে নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে খোঁজা হয় শামীমকে। এরই মধ্যে হঠাৎ করে শামীম রেজার মুঠোফোনে নভো এয়ারলাইন্সের  কক্সবাজার টু ঢাকা ফ্লাইটের পিএনআর বার্তার সূত্র ধরে গত ১০ জুন সকালে কক্সবাজার বিমানবন্দর এলাকা থেকে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয় শামীমকে।

কঠোর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্যে তাকে ঢাকায় নেওয়া হলে সেখানে জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নানা আঙ্গিকে তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরের দিন ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা সিদ্দিকার আদালতে শামীম রেজাকে তোলা হলে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসা বাদে শামীম জানান, সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জন্য তার মাদকের আখড়া থেকে নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করা হতো। পুলিশ ছাড়াও কথিত গণমাধ্যম কর্মীদের অনেকেই তার ডেরা থেকে নিয়মিত মাসোহারা সংগ্রহ করত। পাশাপাশি ঘটনার রাতেও তিনি থানা প্রাঙ্গণে ওসির বাসভবনে দেখা করেন ওসি আরমান আলির সঙ্গে। সেখানে তাদের মধ্যে কথোপকথনের বিষয়টিও প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ জনকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যে হতচকিত হয়ে পড়েন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ যেন বাংলা প্রবাদের মতোই ‘সর্প হইয়া দংশন কর, ওঝা হইয়া ঝাড়।

এসপি শামীমা পারভীন‌ বলেন, প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ওসির সংশ্লিষ্টতার যেসব তথ্য এসেছে সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত সাপেক্ষে বিধি মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসব বিষয়ে আরমান আলি বলেন, ‘অধিক শোকে আমি পাথর হয়ে গেছি। শামীম দেখতে আসলে কেমন? সিনিয়র কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে আমাকে নানা প্রশ্ন করছেন। শামীম আমার বাসভবনে গিয়েছিল! ১০ লাখ টাকা চ্যালেঞ্জ, নানা এক কোটি টাকা চ্যালেঞ্জ। এগুলো কোথায় শুনেছেন। নিশ্চয় শামীমকে দিয়ে কেউ বলিয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আরমান আলি বলেন, ‘প্রতিটা অফিসারকে আমি ডিফেন্ড করার চেষ্টা করতাম। এখন মনে হচ্ছে আমি ভুল মানুষদের ডিফেন্ড করেছি।’

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন