আবাসনে কালো টাকা সাদা: অর্থনীতির গতি নাকি বৈষম্যের নতুন ফাঁদ?
নজরুল ইসলাম আলীম:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘কালো টাকা সাদা’ করার বিষয়টি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকার বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, স্থবির অর্থ বাজারে ফিরিয়ে আনা কিংবা রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির যুক্তিতে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে কালো টাকা বৈধ করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করায় আবারও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।সরকারের যুক্তি হলো—আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনীতির চাকা সচল হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। বাস্তবতাও হলো, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণের কারণে আবাসনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে আবাসন খাত ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ খাতে পরিণত হয়েছে। ফলে সরকার মনে করছে, অপ্রদর্শিত অর্থকে এই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে অর্থনীতি কিছুটা হলেও গতি পাবে।কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর প্রকৃত সুফল কারা ভোগ করবেঅর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ মূলত সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। একজন নিয়মিত করদাতা তার উপার্জনের ওপর আইন অনুযায়ী কর প্রদান করেন। অন্যদিকে কর ফাঁকি দিয়ে বা অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি পরবর্তীতে সামান্য কর দিয়ে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ পেলে কর ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা কমে যায় এবং কর ফাঁকির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবাসন খাতে বিপুল অঙ্কের অপ্রদর্শিত অর্থ প্রবেশ করলে জমি ও ফ্ল্যাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের বড় শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে আবাসনের মূল্য। কালো টাকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হবে এবং প্রকৃত ক্রেতাদের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে একদিকে সম্পদশালী গোষ্ঠীর হাতে বিপুল পরিমাণ জমি ও আবাসন কেন্দ্রীভূত হবে, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভাড়াটিয়া জীবনেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।সরকার যে বিধান রেখেছে—অপ্রদর্শিত অর্থের উৎস নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না—সেটিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, অর্থের উৎস অনুসন্ধানের সুযোগ সীমিত হয়ে গেলে দুর্নীতি, ঘুষ, কর ফাঁকি কিংবা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থও সহজে বৈধতার ছত্রছায়া পেতে পারে। এতে দুর্নীতিবিরোধী নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, কালো টাকা সাদার সুযোগ থাকলেও নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও ভ্যাট আরোপের কারণে প্রকৃতপক্ষে আবাসন খাত আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেলে ফ্ল্যাটের দামও বাড়বে। এতে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সুবিধা পেলেও সাধারণ ক্রেতারা নতুন করে আর্থিক চাপে পড়বেন।আবাসন খাত দেশের প্রায় ২৬৯টি শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে এ খাতের উন্নয়ন নিঃসন্দেহে জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি করনৈতিক ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বৈষম্য আরও গভীর হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাবই বেশি দেখা দিতে পারে।সবশেষে বলা যায়, আবাসন খাতে কালো টাকা বৈধ করার সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ ও রাজস্ব বাড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে; কিন্তু এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি শুধু বিনিয়োগের পরিমাণে নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা ও করনৈতিক ন্যায্যতার ওপরও নির্ভর করে। আর সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- আবাসনে* কালো,টাকা
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: