বোয়ালমারীতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে নিয়োগ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বোয়ালমারী পৌর সদরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি উপেক্ষা করে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ওই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতারও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী অধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে বা অধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে গভর্নিং বডি উপাধ্যক্ষ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিষয়ের ১০ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের তালিকা থেকে তিন সদস্যের একটি প্যানেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবে। পরে উপাচার্য ওই প্যানেল থেকে একজনকে ছয় মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে অনুমোদন দেবেন। কিন্তু কোনো বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নিয়োগ দেবার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, কলেজের প্রভাষক সৈয়দা দিল আশরাফী, সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ও অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে প্রভাবিত করে কিংবা ভুল বুঝিয়ে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে হোসনেয়ারা বেগমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। ফলে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সিরাজুল ইসলামের মেয়ে এবং গভর্নিং বডির সভাপতি কাজী শাহরিন ইসলাম ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হোসনেয়ারা বেগমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেন। প্রায় এক বছর পার হলেও নতুন করে কোনো অনুমোদন বা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিলয় কুমার সাহা, শিরিন হোসেন ও রবীন কুমার লস্করকে ডিঙিয়ে নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষক সমাজের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী অধ্যক্ষের সপ্তাহে অন্তত পাঁচটি ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নামে ক্লাস রুটিনে কোনো ক্লাস নেই। তিনি নিয়মিত কলেজে উপস্থিত হন না এবং ৮ থেকে ১০ দিন পর এসে অনুপস্থিত দিনের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ২ জুলাই বর্ষ সমাপনী পরীক্ষা শেষে অধ্যক্ষ ফরিদ আহম্মেদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের জোরপূর্বক মানববন্ধনে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। ওই মানববন্ধনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগম ও অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম কলেজের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে কলেজের অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম নিজেই ফ্যাসিস্টের দোসর; তিনি নৌকা প্রতীকে বোয়ালমারী উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন। আর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমের লেখা "নন্দিত প্রসূন" নামে একটি কবিতার বই বের হয়েছে। ওই বইয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রশস্তিমূলক মোট ছয়টি কবিতা ঠাঁই পেয়েছে।
এদিকে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অনেক নবীন শিক্ষার্থীই পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাচ্যুত অধ্যক্ষ ফরিদ আহম্মেদকে চেনেন না বলে অনুসন্ধানে জানা আছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার কথা। সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক দায়িত্ব নিতে অপারগ হলে পরবর্তী জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে প্রস্তাব দিতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই বিধি অনুসরণ করা হয়নি।
তারা আরও বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কোনো বহিষ্কারাদেশ দুই মাসের বেশি কার্যকর থাকে না এবং ওই সময় শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বপদে বহাল হওয়ার কথা। কিন্তু নিয়মিত অধ্যক্ষ ফরিদ আহম্মেদের ক্ষেত্রে সেটিও অনুসরণ করা হয়নি বলে তাদের দাবি।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা সভাপতির কাছে মৌখিকভাবে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করায় আমাকে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ এবং পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”
কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কাজী শাহরিন ইসলামের মোবাইল বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মব সৃষ্টির প্রেক্ষিতে কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদকে অপসারণ করা হয়। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদ বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাকে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষের বাসায় হামলা, তালা ভাঙচুর, পরিবারের নারী সদস্যদের মারধর ও লুটপাটের ঘটনার অভিযোগে হোসনেয়ারা বেগমসহ সাতজনকে আসামি করে ২০২৬ সালের ১৬ জুন অধ্যক্ষ ফরিদ আহম্মেদ ফরিদপুর বিজ্ঞ জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: