যুদ্ধের আগুন এখন হরমুজ প্রণালিতে
তেহরান ও তেল আবিবের সীমানা ছাড়িয়ে চলমান সংঘাত এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে বৈশ্বিক জ্বালানির লাইফলাইন হরমুজ প্রণালিতে। একদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) তাদের ‘সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী’ অভিযান শুরু করে হরমুজে মাইন বসাচ্ছে। অন্যদিকে তা ঠেকাতে সেখানে মাইন ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে ইরানের ১৬টি মাইন স্থাপনকারী নৌযান ধ্বংসের দাবি করে নজিরবিহীন পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা হরমুজ প্রণালির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৯ কিলোমিটার। কিন্তু এই সরু জলপথটিই বিশ্ব অর্থনীতির ধমনি। যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ইরান এই কৌশলগত রুটটিতেই সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে এক ফোঁটা তেলও যেতে দেওয়া হবে না। আরব সাগরের এই ‘জ্বালানি যুদ্ধ’ শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই রীতিমতো এলোমেলো করে দিয়েছে।
এই আঞ্চলিক সংঘাত যেন দীর্ঘায়িত না হয় সেজন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে কূটনৈতিক বিশ্ব। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, পুরো অঞ্চল অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠার আগেই অবিলম্বে এই যুদ্ধ থামাতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জরুরি ফোনালাপ করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অন্যদিকে সংঘাত ভুলে সব পক্ষকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে কাতার।
এদিকে মঙ্গলবার রাত থেকে ২ টনের দানবীয় মিসাইল ছুড়ছে ইরান। এর প্রচণ্ড আঘাতে কেঁপে উঠছে তেল আবিবসহ ইসরাইলের বিভিন্ন শহর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি। আকাশ থেকে ধেয়ে আসা অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে রাত নামলেই এখন শহরগুলোতে আতঙ্ক ভর করে। এ অবস্থায় সুর নরম করেছে ইসরাইল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন বলছেন, ‘আমরা অন্তহীন যুদ্ধ চাই না।’ কুয়েতের আল আবিদি এবং বাহরাইনের জুফায়ার ঘাঁটিতে মুহুর্মুহু আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন। এমনকি বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসের ‘লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট ক্যাম্পে’ও হামলা চালানো হয়েছে। আরব আকাশসীমা ব্যবহার করে ছোড়া এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে অন্তত ৬টি ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরব। আবুধাবি ও তেল আবিবে নিজেদের দূতাবাস এবং দুবাইয়ে কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ছেড়েছেন ৪৩ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক।
যুদ্ধের ১২তম দিনে নিহতের সংখ্যা ১৮শ ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন ১৪ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে ইরানে ১৩০০, লেবাননে ৫৭০, ইসরাইলে ১৫ ও ৮ মার্কিন সেনা রয়েছে। এছাড়া ১৪০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আটজনের অবস্থা গুরুতর। ইরান ও লেবাননে নির্বিচারে বেসামরিক অবকাঠামোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসিক এলাকায়ও হামলা চালানো হচ্ছে। এতে দেশ দুটিতে প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মার্কিন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জেনারেল ড্যান কেইনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে ৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, হামলায় দেশটিতে প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১২৯৪৩টি বসতবাড়ি, ১৬১৭টি বাণিজ্যিক স্থাপনা, ৬৫টি স্কুল এবং ৩২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। খবর বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, আলজাজিরা ও তাসনিম নিউজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।
হরমুজ দিয়ে ‘এক লিটার তেল’ও যেতে দেবে না ইরান : তেহরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’র সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং তাদের অংশীদারদের কাছে ‘এক লিটার তেল’ও পৌঁছাতে দেবে না ইরান। তাদের উদ্দেশে যাওয়া যে কোনো জাহাজ বা ট্যাংকার এখন থেকে ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসাবে গণ্য হবে। ইরানের এ মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেল আমদানিকারকরা প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলার হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। কারণ এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপর তেলের দাম নির্ভর করে, যা আপনারা অস্থিতিশীল করে তুলেছেন।
হরমুজ প্রণালিতে পরপর ৩টি জাহাজে হামলা : হরমুজ প্রণালিতে পৃথক তিনটি জাহাজে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হেনেছে বলে বুধবার সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একটি জাহাজে হামলার পর সেটিতে আগুন ধরে যায় এবং বেশির ভাগ কর্মীকে সরিয়ে নিতে হয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওমানের প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘ময়ুরি নারি’ নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার হামলার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, জাহাজটির আগুন নেভানো হয়েছে এবং এতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয়নি। প্রয়োজনীয় কিছু কর্মী এখনো জাহাজটিতে অবস্থান করছেন।
রাত নামলেই আতঙ্কে ইসরাইলিরা : সূর্যাস্তের পরই ইসরাইলজুড়ে নেমে আসে এক অজানা আতঙ্ক। মঙ্গলবার রাত থেকে আইআরজিসি ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে ২ টন ওয়্যারহেডবাহী মিসাইল ছুড়তে শুরু করেছে। এই দানবীয় বোমার আঘাতে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আক্ষরিক অর্থেই ধসে পড়েছে। শহরগুলোতে যখনই সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে, তখন জীবন বাঁচাতে হাজারো মানুষ হন্যে হয়ে মাটির নিচের বাংকারে ছুটতে থাকেন। লেবানন ও ইরান থেকে ধেয়ে আসা অবিরাম এই মিসাইল হামলার কারণে তেল আবিব থেকে হাইফা-পুরো দেশের মানুষেরই এখন নির্ঘুম রাত কাটছে।
যুদ্ধ থামাতে হবে-এরদোগান : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলমান যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করতে হবে, নইলে তা পুরো অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে। এ যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আরও ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করবে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি আরও বাড়বে।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলা : ইসরাইলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটি ভবনে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলের সেনারা যে এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে, তার পাশে এই হামলা করা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
ওমানের সালালাহ বন্দরের তেলের ডিপোতে হামলা : ওমানের সালালাহ বন্দরের তেলের ডিপোতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা আমব্রে। সংস্থাটির বরাতে ওমান টেলিভিশন জানিয়েছে, বন্দরের জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাংকে হামলার হুমকি ইরানের : ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’র মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাংকে হামলার হুমকি দিয়েছেন। ইরানের একটি ব্যাংকে হামলার পালটা ব্যবস্থা হিসাবে এই হুমকি দিল তেহরান।
কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার দাবি করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, কুয়েতের আল-উদাইরি হেলিকপ্টার ঘাঁটি, মোহাম্মদ আল-আহমদ নৌ ঘাঁটি এবং আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।
গুগলসহ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের নিশানা : চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য নতুন লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে আইআরজিসি। তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম চালানো বড় বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির অফিস ও স্থাপনাগুলোও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, আইবিএম, ওরাকল ইত্যাদি।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- যুদ্ধের* আগুন,এখন
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: