• ঢাকা
  • সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ডে দুদকের তদন্ত দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:২৪ এএম;
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ডে দুদকের তদন্ত দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

নজরুল ইসলাম আলীম :


জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ডে সংঘটিত কথিত দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়কাল তদন্তের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে বিগত সরকারের দীর্ঘ সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থপাচার, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারেরও পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রোববার রাতে জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগে বছরের পর বছর ধরে একটি লুটেরা অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এর ফলে জনগণের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক অপচয় ঘটেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শুধু অতীতের সরকারের কর্মকাণ্ড নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতিতে বিশ্বাসী। তাই অভিযোগ যেই সরকারের বিরুদ্ধেই উঠুক না কেন, তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। তিনি উল্লেখ করেন, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্রে অর্থনৈতিক অনিয়ম নিয়ে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলোও তদন্তের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগও যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।বক্তব্যে তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনেরও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনে দুর্নীতি নিয়ে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো সত্য না মিথ্যা তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে কোথায়, কীভাবে এবং কারা অনিয়মে জড়িত ছিল, তা অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জাতির সামনে প্রকাশ করা উচিত।অতীতের অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লুটপাট, ব্যাংকিং খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ, মেগা প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং আইনি কাঠামো ব্যবহার করে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং দেশের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।তিনি আরও বলেন, অর্থপাচার, আদম ব্যবসায় অনিয়ম, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধা প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় নানা দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে ছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, যা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন অর্থনীতি পুনর্গঠন, বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।বাজেটকে তিনি "নিউ ইকোনমিক অর্ডারের বাজেট" হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি শুধু রাজস্ব আহরণ বা ব্যয় ব্যবস্থাপনার বাজেট নয়; বরং দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি রূপরেখা। তিনি দাবি করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে নতুন কর আরোপ না করায় সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি কৃষক, নিম্ন আয়ের মানুষ, ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ, তিনি শুধু অতীতের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেননি; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও ওঠা অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে বিষয়টি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জবাবদিহি, সুশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব যতই থাকুক না কেন, যেকোনো তদন্ত অবশ্যই হতে হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে। কারণ, কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই জনগণের আস্থা অর্জনের প্রধান উপায়।এখন রাজনৈতিক অঙ্গন এবং প্রশাসনিক মহলের দৃষ্টি থাকবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেন কি না এবং দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগগুলো অনুসন্ধানে কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেয় কি না—সেটিই হবে আগামী দিনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। একই সঙ্গে এই বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে নতুন মাত্রা দেবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন