জাতীয় বাজেটে উপেক্ষিত বৃহত্তর বরিশাল: উন্নয়নের মানচিত্রে দক্ষিণাঞ্চল কি আবারও প্রান্তিক?"
নজরুল ইসলাম আলীম :
জাতীয় বাজেট একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা। কোথায় নতুন সড়ক হবে, কোথায় শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, কোন অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হবে—এসবের প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। ফলে বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।কিন্তু চলতি জাতীয় বাজেট নিয়ে বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের মানুষের মধ্যে যে প্রশ্ন ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা সহজেই উপেক্ষা করার মতো নয়। অনেকের অভিযোগ, বাজেটে এই অঞ্চলের জন্য দৃশ্যমান কোনো নতুন বৃহৎ প্রকল্প বা বিশেষ বরাদ্দের ঘোষণা নেই। যদি এ মূল্যায়ন সঠিক হয়, তবে এটি দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন-প্রত্যাশী মানুষের জন্য হতাশাজনক।বৃহত্তর বরিশাল বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কৃষি, মৎস্য, নদীবন্দর, পর্যটন এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের অবদান উল্লেখযোগ্য। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানকার কৃষক ও জেলেদের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। তবুও উন্নয়নের আলো অনেক ক্ষেত্রেই এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বহু সম্ভাবনাময় প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্পায়ন সীমিত, কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম, ফলে অনেক তরুণ জীবিকার সন্ধানে অন্য অঞ্চলে পাড়ি জমান। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও আরও বিনিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমানো। যে অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ও নদীনির্ভর অর্থনীতি জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, সেই অঞ্চলের উন্নয়নেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বাজেটে যদি সত্যিই বৃহত্তর বরিশালের জন্য নতুন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ অনুপস্থিত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি উঠতেই পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য নদীভাঙন রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, আধুনিক নৌপরিবহন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, মৎস্যভিত্তিক শিল্প এবং পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণও সময়ের দাবি।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—জাতীয় বাজেটের মূল্যায়ন হওয়া উচিত পূর্ণাঙ্গ বাজেট দলিল, প্রকল্প তালিকা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ভিত্তিতে। কোনো অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ বা প্রকল্প অন্য মন্ত্রণালয়, চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি বা সংশোধিত বাজেটেও থাকতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।আজকের প্রশ্ন একটাই—দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের প্রত্যাশা কি যথাযথভাবে জাতীয় পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তবে উন্নয়নের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে আগামী বাজেট ও পরিকল্পনায় বৃহত্তর বরিশালের অবকাঠামো, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের জন্য আরও সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।উন্নয়নের বাংলাদেশ গড়তে কোনো অঞ্চল যেন অবহেলিত না থাকে—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি। কারণ একটি অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু সেই অঞ্চলের মানুষের নয়; তা পুরো দেশের অর্থনীতি, সামাজিক অগ্রগতি এবং জাতীয় সংহতিকেও শক্তিশালী করে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- জাতীয়* বাজেটে,উপেক্ষিত
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: