• ঢাকা
  • বুধবার, ২৫ ফেরুয়ারী ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. জাতীয়

সমঝোতার চাঁদাবাজি! রাষ্ট্রপতির আর্তনাদ!


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৫৪ এএম;
সমঝোতার চাঁদাবাজি! রাষ্ট্রপতির আর্তনাদ!
  • গোলাম মাওলা রনি

 

সমঝোতার চাঁদাবাজি নিয়ে সারা দেশ তোলপাড়। নবনিযুক্ত তিনটি বৃহৎ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে ঠিক সেই সময় দেশের অন্যতম শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির যে সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে তা ১৮ কোটি মানুষের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। কালের কণ্ঠের সাক্ষাৎকারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন যেসব কথা বলেছেন তা বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে যেমন ঝামেলায় ফেলবে, তদ্রুপ রাষ্ট্রপতি পদের যে অমর্যাদা হয়েছে তা যদি বর্তমান সরকার সঠিক উপায়ে সুরাহা না করে, তবে আগামীর রাষ্ট্রপতির পথচলাও সম্মানজনক হবে না।

ইচ্ছা ছিল চাঁদাবাজি নিয়ে লিখব।

কারণ প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক চাঁদাবাজির যে বিশাল সিন্ডিকেট বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের ক্ষমতা ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্র ও সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। বাংলাদেশের সর্বত্রই চাঁদাবাজির রমরমা বাণিজ্য চলছে, তবে সড়ক পরিবহনের চাঁদাবাজি রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সংগীতবোদ্ধারা যেভাবে সুর সম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আকবর আলী খাঁ, পণ্ডিত রবিশংকর প্রমুখের সংগীতে মুগ্ধ হয়ে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে সুর মূর্ছনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন, তদ্রুপ বাংলাদেশের চাঁদাবাজরা দলমত, নীতি-নৈতিকতা, আইন-কানুন, ধর্ম-কর্ম এমনকি পিতার পরিচয় পদপিষ্ট করে চাঁদার গরলে নিজেদের মাতাল করার মাধ্যমেই বেঁচে থাকার আনন্দ উপভোগ করে।

সমঝোতার চাঁদাবাজি! রাষ্ট্রপতির আর্তনাদ!

আমি বৃহত্তর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্য ছিলাম।

কাজেই সড়ক ও সেতু বিভাগে কী পরিমাণ চাঁদাবাজি হয় এবং চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য যে কতটা মারাত্মক, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। ২০০৯-১০ সালে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে ওরা আমার জীবনকে তছনছ করে দেওয়ার সব চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনো হুমকি-ধমকিই আমাকে দমাতে পারেনি। উল্টো প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিবাদ করার যে দুনির্বার সাহস সঞ্চয় করেছিলাম, তা আজ অবধি আমার জীবনের অন্যতম মূলধন হয়ে আছে। 

সুতরাং ২০০৯ সাল থেকে আজ অবধি বাংলাদেশে চাঁদার বাজার, চাঁদাবাজির ডনদের উত্থান এবং বিস্তৃত চাঁদার রাজ্য আরব্য রজনীর রমরমা গল্পের মতো মদ-নারী-অর্থ-ক্ষমতার যে ভূমিকা চলে তা প্রতি মুহূর্তে আমাকে যারপরনাই ব্যথিত করে।

উল্লিখিত অবস্থায় নবনিযুক্ত মন্ত্রীর সমঝোতামূলক চাঁদাবাজির তথ্য নিয়ে যখন বিস্তারিত লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ঠিক তখনই রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের সাক্ষাৎকারটি নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় চাঁদাবাজি নিঃসন্দেহে বড় আকারের মারণব্যাধি ক্যান্সার। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে গত সতেরো মাসে যা হয়েছে তা ক্যান্সারের চেয়েও মারাত্মক। আমি আমার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে রাষ্ট্রপতির আর্তনাদ, ড. ইউনূসের বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক কনটেন্ট তৈরি করেছি, যা রাষ্ট্রপতির নজরে এসেছে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কালের কণ্ঠ রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেখানে এমন সব ভয়াবহ তথ্য সামনে চলে এসেছে, যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অতি জরুরি।

 

প্রথমত, ইউনূস জামানায় বঙ্গভবনে কেমন ছিলেন আমাদের রাষ্ট্রপতি! কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে এ কথা স্পষ্ট যে তিনি সেখানে কার্যত বন্দি ছিলেন। যদি তিন বাহিনী প্রধান এবং বিএনপির ইতিবাচক মনোভাব না থাকত, তবে রাষ্ট্রপতি শুধু পদে পদে বেইজ্জতি নয়, তিনি পদচ্যুৎ হতেন এবং দুর্বৃত্তরা সুযোগ পেলে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীকে অপমান-অপদস্থ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কী লাভ হয়েছে তা বলতে পারব না, তবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কী কী মহাক্ষতি হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত কিছু নমুনা তুলে ধরছি।

আমাদের রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং সংসদের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সেতুবন্ধ রয়েছে তা গত সতেরো মাস ধরে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য। তিনিই ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানগুলোর প্রধান মেহমানরূপে অনুষ্ঠানকে মর্যাদা প্রদান করেন। গত সতেরো মাসের মবের সরকার ছাত্রদের লেখাপড়ার পরিবর্তে মবতন্ত্র উৎসাহিত করেছে। লেখাপড়া শেষ করে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সফলতার সার্টিফিকেট গ্রহণ করার চেয়ে দলে দলে বঙ্গভবনের সামনে গিয়ে বঙ্গভবনের প্রতিটি ইট খুলে রাষ্ট্রপতিকে গদিচ্যুত করার জন্য উসকানি দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনের লেখাপড়া লাটে উঠেছে এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মান শত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায় পৌঁছে গেছে।

ড. ইউনূস একজন শিক্ষক এবং তাঁর সরকারে শিক্ষকদের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করলেন তা আমার বোধগম্য নয়। ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমায় তিনি বহুবার বিদেশে গেছেন এবং বহু অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে চরকির মতো ছুটে বেড়িয়েছেন—অথচ নিজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈদিক যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও বহু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের অপরিহার্য বিধান। দুর্নীতি দমন কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া, অডিটর জেনারেলের অফিসের কার্যক্রম, সংসদ অধিবেশনের শুরু বা সমাপ্তি, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সভাপতিত্ব ছাড়াও রাষ্ট্রপতির কুচকাওয়াজ, সামরিক বাহিনীর জাতীয় প্যারেড এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির জেন্টলম্যান ক্যাডারদের কমিশন লাভের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি আমাদের দেশের ঐতিহ্য। বিদেশি দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রপতির ছবি টাঙানো ছাড়াও দেশের সরকারি-অফিস আদালতে রাষ্ট্রপতির ছবির অপরিহার্যতা মূলত আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখত। ড. ইউনূসের সরকার বাঙালির স্বাধীনতা রিসেট করতে গিয়ে আমাদের পরাধীন মনমানসিকতা এবং দাসত্বের শৃঙ্খল দ্বারা যেভাবে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন তার ফলে সুবে বাংলায় নতুন মীরজাফর, রবাট ক্লাইভ বা বর্গীদের আক্রমণ হলে আমজনতা রুখে দাঁড়ানোর পরিবর্তে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দাসত্ব বরণের জন্য উন্মাদনা শুরু করে দেবে।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সবচেয়ে অমানবিক কাণ্ড ছিল তাঁর স্বাধীনতাহরণ এবং তাঁকে কার্যত গৃহবন্দি করে তাঁর চিরায়ত মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটিয়ে তাঁর দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা। একই সঙ্গে তাঁর মাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের যে সেতুবন্ধ ছিল তাও ইউনূস সরকার ছিন্ন করে দিয়েছিল। প্রথা মতে বিদেশি রাষ্ট্রদূতগণ বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর নিজেদের পরিচয়পত্র রাষ্ট্রপতিকে প্রদান করেন এবং এই উপলক্ষে বঙ্গভবনে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। রাষ্ট্রপতির প্রেস উইংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গণমাধ্যমসমূহে সেসব অনুষ্ঠানের খবর ফলাও করে প্রকাশিত হয়ে থাকে। ইউনূস জামানায় রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং অকার্যকর করে রাখা হয়। ফলে বাংলাদেশে কোন রাষ্ট্রদূত এলেন বা দায়িত্ব শেষে কে চলে গেলেন তা যেমন দেশবাসী জানতে পারেনি, তেমনি বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা যখন কার্যত গৃহবন্দি রাষ্ট্রপতির অসহায়ত্ব নিজ চোখে দেখেছেন তখন মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের রুচি-অভিরুচি নিয়ে কী চিন্তা করেছেন তা যে কেউই আন্দাজ করতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সবচেয়ে বড় অবিচার করেছেন স্বয়ং ড. ইউনূস নিজে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী তিনি বিদেশে যাওয়ার আগে এবং পরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রপতিকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন। কিন্তু তাঁর কার্যকালের পুরোটা সময় তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেননি। অধিকন্তু জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতেও রাষ্ট্রপতিকে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে যে গর্হিত কাজ করেছেন তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা অপরাধ—সে কথা আমার চেয়ে মুফতি মাওলানারা ভালো বলতে পারবেন।

আমরা আজকের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। কালের কণ্ঠের সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে বলেছেন যে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ভালো আছেন। রাষ্ট্রপতির এই অনুভূতি তারেক রহমান সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে বড় প্রাপ্তি। আমরা চাই রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিগত সরকার যেসব অনিয়ম করেছে এবং তাঁর ওপর যে জুলুম-অত্যাচার হয়েছে তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং নিরপেক্ষ বিচার হোক। অন্যথায় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতির জন্য বঙ্গভবনে বসবাস কোনোমতেই সম্মানজনক হবে না। দ্বিতীয়ত, নতুন সরকার তার রাজনৈতিক প্রয়োজনেই নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান রাষ্ট্রপতির বিদায় অনুষ্ঠানটি যদি সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, তবে তা দেশের জন্য সার্বিক বিবেচনায় কল্যাণকর হবে।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক

 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন