বারুদে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতে জ্বলছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে গেছে তেহরান থেকে তেল আবির, রিয়াদ থেকে বৈরুত, দুবাই থেকে নিকোশিয়া (সাইপ্রাস) পর্যন্ত। সংঘাতের চতুর্থ দিন গতকালও ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী। ওমান উপসাগরে ইরানের সব যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানের ৭৮৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। পাশাপাশি বাহরাইন, সৌদি আরব, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারে মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। কুয়েতের মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করার পাশাপাশি নিজ দেশের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্যের ১৫টি দেশ ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউস। এদিকে ইসরায়েলের বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ এবং ইরাকে মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা হোটেলে হামলা চালিয়েছে শিয়াপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’। জবাবে লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
গতকাল রাতেও ইরানের বিভিন্ন শহরে শক্তিশালী বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী। তেহরানে দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গত কয়েক রাতের তুলনায় সোমবার রাতের এ বোমাবর্ষণ ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের একটি ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনেও বিপুল বোমাবর্ষণ হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ওমান উপসাগরে ইরানের সব যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা। এ ছাড়া দেশটির রাষ্ট্রীয়
টেলিভিশন আইআরআইবি কমপ্লেক্সেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে টেলিভিশনটির সম্প্রচার এখনো চালু রয়েছে। কেবল তেহরানই নয়, কারাজ, কোমসহ ইরানের অন্যান্য বড় শহরেও ব্যাপক বোমাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে নিহত বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট। অন্যদিকে পাল্টা জবাবে দখলদার ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল ছোড়ে ইরান। অধিকাংশ মিসাইল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আটকে দিলেও কয়েকটি মিসাইল ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানে। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, মিসাইল হামলার কারণে উত্তর ইসরায়েলে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। এর আগে ছোড়া মিসাইলের মধ্যে একটি ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে সরাসরি আঘাত হেনেছে। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলা আরও তীব্র হবে। শত্রুদের জন্য সামনে আরও ভয়াবহ এবং ক্রমাগত শাস্তিমূলক হামলা অপেক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর মুহূর্তের মধ্যে জাহান্নামের দরজাগুলো আরও বেশি করে উন্মুক্ত হতে থাকবে। ইসরায়েল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন অবকাঠামোতেও হামলা করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার ভোরে সেখানে দুটি ড্রোন আঘাত হানে। সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি খুবই কম হয়েছে। কুয়েতেও মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। কাতারের রাজধানী দোহাতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির একটি জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনালে আঘাত হেনেছে ড্রোন। এতে সেখানে আগুন লেগে যায়। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা ব্যালিস্টিক মিসাইলের ঝাঁক এখন আরব আমিরাতের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ঠেকানোর চেষ্টা করছে। বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। এ ছাড়া ইরান থেকে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা : বিশ্বজ্বালানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এ পথ দিয়ে কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে।
আইআরজিসির নতুন প্রধান আহমদ ভাহিদির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইবরাহিম জাব্বারি সোমবার বলেন, প্রণালিটি এখন থেকে বন্ধ করা হলো। কোনো জাহাজ এটি পার হওয়ার চেষ্টা করলে বিপ্লবী গার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরা সেটি পুড়িয়ে দেবে।
তিনি জানান, আইআরজিসি তেলের পাইপলাইনগুলোতেও হামলা চালাবে এবং এ অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও বাইরে যেতে দেবে না। জাব্বারির দাবি, এ উত্তেজনার ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, হাজার হাজার কোটি ডলারের ঋণে জর্জরিত মার্কিনিরা এ অঞ্চলের তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা জেনে রাখুক, এক ফোঁটা তেলও তাদের কাছে পৌঁছাবে না।
আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করলেন ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময় পার হয়ে গেছে।
কুয়েত দূতাবাস বন্ধ, নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগের নিদের্শ যুক্তরাষ্ট্রের : চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্টে কুয়েতের মার্কিন দূতাবাস বলেছে, ‘আমরা সব নিয়মিত এবং জরুরি কনস্যুলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট (আবেদন) বাতিল করেছি।’ এ ছাড়া সৌদি আরবের রিয়াদ ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সব ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিলের ঘোষণা করেছে। সতর্কবার্তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, যত দ্রুত সম্ভব উপলব্ধ বাণিজ্যিক ফ্লাইট বা অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমে দেশ ত্যাগ করুন।
সংঘাতে ছয় মার্কিন সেনা নিহত : ইরানে চলমান অভিযানে অন্তত ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের প্রাথমিক পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি স্থাপনা থেকে নিখোঁজ দুই সেনার লাশ সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিহতের সংখ্যা ৬-এ দাঁড়িয়েছে। তবে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে ইরানের প্রতিশোধমূলক ‘ট্রু প্রমিজ ৪’ অভিযানের প্রথম দুই দিনে ৬৫০ জনেরও বেশি মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্য হতাহত হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে চালানো হামলায় হতাহতের এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির অভিজাত বাহিনী।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েইনি বলেছেন, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর সদরদপ্তর এবং যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ ইরানের উপকূলীয় জলসীমা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে বলে দাবি করেছেন নায়েইনি। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে ৬৫০ জন মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। আমেরিকানদের জন্য এ হতাহতের খবর অস্বীকার বা গোপন করা স্বাভাবিক। তবে ইরানের গোয়েন্দা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য হতাহতের এ সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
নায়েইনি বলেন, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে একাধিকবার আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। তিনি বলেন, বাহরাইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো এক হামলায় ১৬০ মার্কিন সদস্য হতাহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইরানের নৌবাহিনীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন নৌবাহিনীর এমএসটি কমব্যাট সাপোর্ট জাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আইআরজিসির এ মুখপাত্র বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের চাবাহার উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ রণতরি লক্ষ্য করে চারটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরানের নৌবাহিনী। নায়েইনি বলেন, এ হামলার পর রণতরিটি ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পালিয়ে গেছে।
ইরানে ইহুদিবাদী ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আগ্রাসনের জবাবে ইরানি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে এ ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’ পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- বারুদে* জ্বলছে,মধ্যপ্রাচ্য
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: