• ঢাকা
  • বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. বিচিত্র সংবাদ

উদ্বোধন হয়েছে আগেই, অপেক্ষায় জ্ঞানচর্চা


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ০৪ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৩৩ এএম;
উদ্বোধন হয়েছে আগেই, অপেক্ষায় জ্ঞানচর্চা

নুর-আমিন , দিনাজপুর (বীরগঞ্জ ও খানসামা):

 

উদ্বোধনের ফিতা কাটা হয়েছিল জাঁকজমক করে। বলা হয়েছিল—এখান থেকেই শুরু হবে তরুণদের জ্ঞানযাত্রা। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতা যেন নির্মম এক বিদ্রূপ। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরি আজও রয়ে গেছে নামমাত্র। দেয়াল আছে, ছাদ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। তাকগুলো শূন্য—একটিও বই নেই। জ্ঞানচর্চার আশায় যারা তাকিয়ে ছিল, তাদের চোখে এখন শুধুই হতাশা।

প্রায় ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ লাইব্রেরিটি গত বছরের ২৭ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন—এই লাইব্রেরি হবে উপজেলার তরুণ প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। তবে তিন মাস পার হলেও বাস্তবে শুরু হয়নি কোনো কার্যক্রম।

এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পাবলিক লাইব্রেরি উদ্বোধনের পরও কার্যত অচল থাকায় প্রশ্ন উঠছে—এই আয়োজন কি কেবল ক্যামেরার সামনে দায় সারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল? সেদিন শোনানো আশার বাণীগুলো কি আজ ফাঁপা কথায় পরিণত হয়নি?

লাইব্রেরি মানে শুধু ভবন নয়—লাইব্রেরি মানে বই, পাঠক, পরিবেশ আর নিয়মিত কার্যক্রম। অথচ এখানে নেই কোনো বই, নেই পাঠক, নেই দৃশ্যমান উদ্যোগ। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরিবিলি পড়াশোনা করবে, অভিভাবকেরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে—সেই জায়গাটি এখন অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত ভবনটির কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। কয়েকটি জানালায় চূড়ান্ত রঙের কাজ বাকি, বৈদ্যুতিক সংযোগ পুরোপুরি স্থাপন হয়নি। ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রীর চিহ্ন। ফলে লাইব্রেরি চালুর উপযোগী হয়নি ভবনটি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বইয়ের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। বুকশেলফ থাকলেও সেখানে নেই পাঠ্যপুস্তক, রেফারেন্স বই কিংবা দৈনিক পত্রিকা। ফলে লাইব্রেরির মূল উদ্দেশ্য এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি পাবলিক লাইব্রেরি কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বই, আলো-বিদ্যুৎ, আসবাব ও পাঠকের উপস্থিতিতেই তার প্রাণ। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া উদ্বোধন করায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা লাইব্রেরি চালুর আশায় ছিলাম। পড়াশোনার জন্য শান্ত ও ভালো পরিবেশ খুব দরকার। কিন্তু তিন মাসেও কাজ শেষ না হওয়ায় হতাশ লাগছে।”

ঠিকাদার বেলাল হোসেন জানান, “ইউএনও স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেছেন, এ মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে। আমি সেই অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। দ্রুত সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা হবে।”

উপজেলা প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “জানালার থাই, রং ও ইলেকট্রিকের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সেগুলো শেষ হলেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে।” বই না আসার বিষয়ে তিনি জানান, “বই কেনার জন্য আলাদা বরাদ্দ প্রয়োজন। নির্মাণ বাজেটের সঙ্গে বইয়ের অর্থ অন্তর্ভুক্ত নয়।”

উপজেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, “ঠিকাদারকে ডাকা হয়েছে। গুণগত মান নিশ্চিত করে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে নিম্নমানের কাজ গ্রহণ করা হবে না।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—উদ্বোধনের আগেই কেন কাজ সম্পূর্ণ করা হলো না?

খানসামাবাসীর দাবি, অবিলম্বে বাকি কাজ শেষ করে আলাদা বরাদ্দের মাধ্যমে বই সংগ্রহ করা হোক। যেন ৫৩ লাখ টাকার এই প্রকল্প কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত জ্ঞানকেন্দ্রে রূপ নেয়।

এখন সবার অপেক্ষা—কবে খুলবে লাইব্রেরির দরজা, আর কবে বইয়ে ভরে উঠবে খালি তাকগুলো?

দৈনিক পুনরুত্থান / নুর-আমিন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন