ব্রিটেনে মুসলিমদের অজু ও চাল ধোয়াতে পানি কম ব্যবহারের পরামর্শ ঘিরে বিতর্ক
যুক্তরাজ্যে পানি সাশ্রয়ের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এশীয় ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে রান্নার আগে চাল কম ধোয়া এবং নামাজের আগে ওজুর সময় কম পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, পানি সাশ্রয়ের যুক্তি দিয়ে এ নির্দেশনা জারি করেছে দেশটির পানি শিল্প খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফওয়াট’।
কিন্তু সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর জন্য এই ‘উদ্ভট’ নির্দেশনার পেছনে গ্রাহকের বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে এখন সমালোচনার মুখে পড়েছে এই সংস্থা।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ ও পূর্ব এশীয়দের কম পানিতে রান্নার কাজ ও চাল ধোয়া শেখাতে ২ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড ব্যয় করে একটি গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে ‘অফওয়াট’। তাতে যুক্ত করা হয়েছে একজন তারকা শেফকে।
পাশাপাশি, নামাজের আগে ওজু করার সময় মুসলমানদের মাত্র এক লিটার পানি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
এবারের গ্রীষ্মে তীব্র গরম আর খরার কারণে যুক্তরাজ্যের পানি শিল্প খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে। সে কারণে এর আগে বিভিন্ন জায়গায় হোসপাইপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পানির ব্যবহার সীমিত করতে দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
‘সাউথ স্টাফোর্ডশায়ার ওয়াটার’-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ওই প্রকল্পটি মূলত একটি পানি সাশ্রয়ী কর্মসূচির অংশ। কিছু অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে চাল বা খাবার সামগ্রী ধোয়ার ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত’ পানি ব্যবহারের প্রবণতা দেখার কথা তুলে ধরে তাদের অভ্যাস বদলানোর জন্য একটি ‘প্রচারাভিযান’ শুরু করেছিল তারা।
কিন্তু সমালোচকরা ওই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, প্রতিদিন অবকাঠামোর ত্রুটি ও লিকেজের কারণে যে ১০০ কোটি লিটারের বেশি পানি নষ্ট হচ্ছে, পানি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর উচিত সেদিকে নজর দেওয়া।
ব্রিটেনের বিরোধী দলের ছায়ামন্ত্রী মাইক উড বলেন, “পানির অপচয় কমানো একটি মহৎ বিষয়, কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল গ্রাহকের অর্থের অপচয়।”
তিনি বলেন, “পরিবারগুলো এমনিতেই পানির জন্য বিশাল বিলের চাপে আছে। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চা পরিবর্তনের মত উদ্ভট প্রকল্পে তাদের টাকা খরচ হচ্ছে জেনে তারা মোটেও খুশি হবে না।”
জলবায়ু সংকট মোকাবিলার উপায় খুঁজতে ২০২০ সালে অফওয়াট ৬০ কোটি পাউন্ডের ‘ওয়াটার ইনোভেশন ফান্ড’ চালু করে। এর অর্থায়ন করা হয় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গ্রাহকদের পয়সায়।
গবেষকরা দেখতে পান, রান্নার আগে চাল ধোয়ার জন্য পরিবারগুলো গড়ে সাত লিটার পানি ব্যবহার করে, যেখানে মাত্র এক লিটার পানিই যথেষ্ট।
এ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারের জন্য ২০১৪ সালের মাস্টারশেফ বিজয়ী তারকা শেফ পিং কুম্বসকে আনা হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, “পানি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত ৫ থেকে ৭ বার চাল ধোয়াটা একটি সাধারণ অভ্যাস। কিন্তু সত্যিই কি এতবার চাল ধোয়ার দরকার আছে? আমি আসলে মাত্র দুবার চাল ধুই।”
চাল ধোয়া পানি ফেলে না দিয়ে ঘরের গাছপালায় দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় অফওয়াটের নির্দেশনায়।
গবেষণার আরেকটি বিষয় ছিল মুসলমানদের অজুর সময় পানি ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে। কল খুলে রেখে ওজু করলে ৬ থেকে ১২ লিটার পানি খরচ হয়। নামাজের জন্য দিনে অন্তত পাঁচবার ওজু করা হয়।
পানি সাশ্রয়ের জন্য কেমব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদের আশপাশের কিছু মুসলিম পরিবারকে মহানবীর (সা.) দেখানো পদ্ধতিতে মাত্র এক লিটার পানি দিয়ে ওজু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গবেষণায় দাবি করা হয়, এর ফলে পানির ব্যবহার প্রায় ১০ গুণ কমে যায়। এই পদ্ধতি সবাই গ্রহণ করলে জনপ্রতি দিনে ৫৫ লিটার পর্যন্ত পানি বাঁচানো সম্ভব।
কেমব্রিজের কিছু মুসলিম পরিবারের ওপর ওই নির্দেশনার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়। পরে ইসলামিক টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারের মাধ্যমে এ নির্দেশনা ছড়িয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তবে পানি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সময় সতর্ক থাকতে বলা হয়, যেন তাদের কথায় এরকম মনে না হয় যে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে বেশি পানি অপচয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
সাউথ স্টাফস ওয়াটারের একজন মুখপাত্র বলেন, “পানি সম্পদের ব্যবস্থাপনায় পানি সাশ্রয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা আমাদের গ্রাহকদের সচেতন করছি। আমাদের এই সম্পৃক্ততা এ অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় জনতাত্ত্বিক অবস্থাকেই প্রতিফলিত করে।”
অফওয়াটের একজন মুখপাত্র বলেন গত গ্রীষ্মের দীর্ঘ শুষ্ক আবহাওয়া মনে করিয়ে দেয় যে পানি একটি সীমিত ও মূল্যবান সম্পদ।
“বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে পানি সাশ্রয়ের ব্যবহারিক পরামর্শ দিতে এই পাইলট প্রকল্প চালানো হয়, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলে শেষ হয়েছে। এতে কাউকে কী করতে হবে বা হবে না তা নির্দেশ দেওয়া হয়নি কিংবা কারও ধর্মীয় উপাসনা বা প্রথায় হস্তক্ষেপ করা হয়নি।”
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: