• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. সম্পাদকীয়

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ: স্বাধীনতার চেতনার অমর আহ্বান


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৫৪ এএম;
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ: স্বাধীনতার চেতনার অমর আহ্বান

নজরুল ইসলাম আলীম:

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু দিন রয়েছে, যেগুলো কেবল একটি জাতির অতীতের স্মারক নয়, বরং ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও। তেমনই এক অনন্য ও গৌরবময় দিন ৭ই মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এ লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তা শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; বরং তা ছিল একটি পরাধীন জাতির স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা, আত্মমর্যাদার ঘোষণা এবং মুক্তির সংগ্রামের চূড়ান্ত আহ্বান।বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়নের পটভূমিতে ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল ইতিহাসের এক অনিবার্য পরিণতি। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ ক্রমাগত বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের দাবি—প্রতিটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সেই ধারাবাহিকতার পরিণতিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করেছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-কে। কিন্তু গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা কৌশলে তা বিলম্বিত করতে থাকে।এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলা। সর্বত্র শুরু হয় প্রতিবাদ, মিছিল, সভা-সমাবেশ। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে জাতির সামনে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটেই ৭ই মার্চের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল একদিকে আবেগময়, অন্যদিকে অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলে ভরপুর। তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়েও জাতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সেই অবিস্মরণীয় আহ্বান—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।এই ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল। সেই সময় পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হতো। তাই বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন—কর না দেওয়া, প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য করা, সরকারি কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি করা। এর ফলে কার্যত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা পূর্ব বাংলায় অকার্যকর হয়ে পড়ে।অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলা ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিণত হয়। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শ্রমিক ও কৃষক—সবাই তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করতে থাকে। এর ফলে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য মানসিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত হয়ে ওঠে।কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেয়নি। ২৫ মার্চ রাতে তারা শুরু করে বর্বরতম গণহত্যা, যা ইতিহাসে পরিচিত অপারেশন সার্চলাইট নামে। এর পরপরই শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা পরিণত হয় মহান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-এ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবশেষে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব এখানেই যে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির স্বাধীনতার রূপরেখা। ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নির্দেশনা ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু জনগণকে শুধু আন্দোলনের ডাকই দেননি, বরং শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশও দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—কোনো অরাজকতা বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না। এর মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকে একটি সুশৃঙ্খল ও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।

৭ই মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১৭ সালে এই ভাষণকে “Memory of the World” বা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণিত হয়েছে যে এই ভাষণ শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে দাঁড়িয়ে ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—একটি জাতির শক্তি কোথায়। সেই শক্তি অস্ত্র বা সামরিক ক্ষমতায় নয়; সেই শক্তি নিহিত থাকে জনগণের ঐক্য, নেতৃত্বের প্রজ্ঞা এবং স্বাধীনতার প্রতি অদম্য আকাঙ্ক্ষায়।বর্তমান প্রজন্মের কাছে ৭ই মার্চ তাই শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি একটি মূল্যবোধ, একটি চেতনা। এই ভাষণ আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অধিকার আদায়ে দৃঢ় হতে এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে।আজকের বাংলাদেশ নানা সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতন্ত্রের বিকাশ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা—এসব ক্ষেত্রেই আমাদের সামনে রয়েছে নতুন দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ৭ই মার্চের চেতনা আমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারে।অতএব, ৭ই মার্চ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও প্রেরণা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠের আহ্বান বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হবে—স্বাধীনতার চেতনা ও আত্মমর্যাদার অমর প্রতীক হয়ে।

দৈনিক পুনরুত্থান / নজরুল ইসলাম আলীম:

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন