• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. সম্পাদকীয়

এই বালেন্দ্র সেই বালেন্দ্র নয়!


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:২৫ এএম;
এই বালেন্দ্র সেই বালেন্দ্র নয়!
  1. উপ-সম্পাদকীয়

এই বালেন্দ্র সেই বালেন্দ্র নয়!

  • গোলাম মাওলা রনি

বালেন্দ্র নিয়ে বিস্তারিত লেখার আগে শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করতে চাই। আমাদের আবহমান বাংলার কথ্য রীতিতে বালেন্দ্র শব্দটি ব্যঙ্গাত্মক। বাংলার জমিনে কাউকে বালেন্দ্র বলে ডাকাডাকি করলে লোকটি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কি না বলতে পারব না। কিন্তু নেপাল অথবা ভারতের হিন্দুভাষী জনগণের মধ্যে বালেন্দ্র শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাকর।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহকে নিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতিতে রীতিমতো তোলপাড় হচ্ছে। আর বাংলাদেশে তো জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক-নায়িকাদের রীতিমতো তুলাধোনা করা হচ্ছে। বালেন্দ্র শাহ যাঁর বর্তমান বয়স মাত্র ৩৬ বছর এবং যিনি প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। ২০২২ সালে বালেন্দ্র যখন মেয়র হলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩২ বছর ছিল।

তিনি ক্ষমতাসীন নেপালি প্রধানমন্ত্রী ওলির কঠোর সমালোচক ছিলেন এবং ক্ষমতাসীন দলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী রূপে কাঠমাণ্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়ে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন।

 

শিক্ষাজীবনে বালেন্দ্র স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করলেও র‌্যাপসংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং সারা দেশে একজন র‌্যাপার সংগীতশিল্পী হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি কিভাবে বিজয়ী হলেন এবং ২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলনের সময় কিভাবে তরুণদের আইকনে পরিণত হলেন এবং দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত পুরনো দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি বা আরএসপিতে নিজে একীভূত হলেন এবং বিপ্লবীদের একীভূত করে বিপ্লব-পরবর্তী রাজনীতিতে কিভাবে সফল হলেন সেই কাহিনি বলার আগে বালেন্দ্র শব্দের অর্থ নিয়ে চলুন একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে আসি—

এই বালেন্দ্র সেই বালেন্দ্র নয়!বালেন্দ্র শব্দটি বাংলা সাহিত্যের একটি চমকপ্রদ শব্দ। যদিও শব্দটি হিন্দিসহ অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় ব্যাপক ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু বাংলার কথ্য রীতিতে শব্দটি জনপ্রিয় না হলেও পৌরাণিক সাহিত্যে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বালেন্দ্র শব্দটি যদি আপনি অনুধাবন করতে চান, তবে সন্ধিবদ্ধ শব্দটিকে প্রথমে আলাদা করতে হবে সন্ধিবিচ্ছেদের নিয়মে। বাল+ইন্দ্র=বালেন্দ্র। এখানে বাল শব্দের অর্থ নবীন-কচি=নতুন। অন্যদিকে ইন্দ্র শব্দের অর্থ চাঁদ, শ্রেষ্ঠ, অধিপতি, রাজা, রাজর্ষি, সূর্যালোক ইত্যাদি।

সুতরাং বালেন্দ্র বলতে আপনি সম্মানিত তরুণদের নেতা, তরুণ রাজর্ষি আলোকময় বা জ্যোর্তিময় তারুণ্যের শ্রেষ্ঠতম প্রতিভূ ইত্যাদি বলে সম্বোধন করতে পারেন। আলোচনার শুরুতে আমি যদি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর বৃত্তান্ত এবং বালেন্দ্র নামের মহত্ত্ব বর্ণনা না করে বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের জেন-জিদের বালেন্দ্র বলে ডাকাডাকি করতাম, তাহলে রাগে-ক্ষোভে অনেকেই হয়তো এক দুই তিন চার—রনি...মার! টিনের চালে কাউয়া রনি আমার...বাল গালাগাল করতেন। কেউবা আমার উয়া মাউয়া ছিঁড়ে ফেলার জন্য হুংকার ছাড়তেন।

 

আলোচনার ভূমিকার পর্ব শেষ। এবার শিরোনাম নিয়ে কথা বলব। নেপালের বিপ্লবীরা বিপ্লব সফল হওয়ার পর কোনো মব করেনি। চাঁদাবাজি, নিয়োগ-বদলি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মামলাবাজি করেনি। তারা কোনো গফুর মিয়া অথবা শান্তি দাদুর লুঙ্গির কাছে নিজেদের বিসর্জন দেয়নি। হায় আল্লাহ খালেদ—পলিথিন কন্যা, শ্বেতশুভ্র চুলওয়ালা বুদ্ধিজীবী, আমেরিকার পোষ্য—ছবি মামা, গোল আলুর বাচ্চু চাচা কিংবা তিতু মামাদের খপ্পরে পড়েনি।

নেপালের বালেন্দ্ররা সবার আগে তরুণদের আইকন সফল রাজনীতিবিদ কাঠমাণ্ডর মেয়র বালেন্দ্র শাহর কাছে গিয়েছে। বালেন্দ্র শাহ পুরো বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। কাঠমাণ্ডুর মেয়র হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা থেকেই বালেন্দ্র বুঝেছেন জাতীয় নির্বাচন করতে হলে অবশ্যই পুরনো এবং বড় একটি রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় দরকার। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়। এই দলটি ২০২২ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী চতুর্থ বৃহত্তম দল হিসেবে স্বীকৃত ছিল এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচণ্ড সরকারের অংশীদার ছিল। প্রচণ্ড ছাড়াও রবি লমিচ্ছান্মির মতো অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও ছিলেন।

আরএসপির নেতৃবৃন্দ ২০২৬ সালের নির্বাচনে বালেন্দ্রকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেন এবং বিপ্লবের অংশীদার জেন-জির যেসব সদস্য নির্বাচনে জয়লাভ করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন তাঁদের দলীয় মনোনয়ন দেয়। নেপালের অন্তর্বর্তী সরকার কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেনি এবং জেন-জির বিপ্লবীরা সাবেক সরকারের কোনো মন্ত্রী, এমপি কিংবা নেতাকর্মীকে একটুও নাজেহাল করেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল দেশে একটি বিপ্লব হয়েছে এবং ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য। তারা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ওলিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে এবং স্বয়ং বালেন্দ্র ঝাপা-৫  নামক সংসদীয় আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন।

নেপালের প্রেক্ষাপটে যা ঘটেছে তা যদি বাংলাদেশের বালেন্দ্ররা করতে পারতেন, তবে কী হতো! প্রথমত, তারা দেশের পরীক্ষিত সৎ কোনো বিচারপতি, আমলা, বুদ্ধিজীবীকে সরকারপ্রধান বানাতে পারতেন, যারা নেপালের সুশিলা কার্কির মতো দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ম্যাজিস্ট্রেট মুনির চৌধুরীদের হাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়ে তারা যদি রাজনীতির মযদানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতেন, তবে বাংলাদেশেও নেপালের মতো ইতিহাস তৈরি হতো।

তাঁরা যদি রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি অথবা জামায়াতের মতো দলের সঙ্গে একক সমঝোতায আসতেন এবং প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মতো বাংলাদেশে একজন বালেন্দ্র মনোনীত করতেন এবং নিজেরা মন্ত্রী-এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তবে আজকের দৃশ্য দেখতে হতো না। রাজনীতিতে যেই লাউ সেই কদু—আগেই ভালো ছিলাম—এক জালেম গেছে আরেক জালেম আসছে— ইত্যাদি যেসব কথাবার্তা সাধারণ জনগণকে শুনতে হচ্ছে তা অবশ্যই ঘটত না। আজকের দিনে আমাদের জেন-জির মধ্যে যে হতাশা অথবা আরেকটি বিপ্লব ঘটানোর জন্য যেসব হুমকি-ধমকি ও ফিসফাঁস শোনা যাচ্ছে তা আগামীর রাজনীতির জন্য জীবন্ত আগ্নেয়গিরি তৈরি করছে বলে রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আশঙ্কা করছেন।

আমরা আজকের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এবার শিরোনাম প্রসঙ্গে সংক্ষেপে আলোচনা করে নিবন্ধের ইতি টানব। শিরোনামে উল্লেখ করেছি যে এই বালেন্দ্র সেই বালেন্দ্র নয়। এই বালেন্দ্র বলতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমাদের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের নেতাকর্মীরা যাঁদের বিশ্বাস করেছিলেন তাঁদের প্রায় সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। যাঁদের হাতে বিপ্লবের ফসল আবাদ করার জন্য দেওয়া হয়েছিল তাদের অনেকে সেই ফসল হয় নষ্ট করেছেন, নতুবা আত্মসাৎ করেছেন। যাদেরকে দেশ-জাতির সংস্কার সাধনের জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল তারা এত সুনিপুণভাবে নিজেদের সংস্কার সাধন করেছেন, যা শোনার পর নেপালের বালেন্দ্ররা আর্ত চিৎকার করে বলেছেন, আমরা কোনো অবস্থায়ই নেপালকে বাংলাদেশ হতে দেব না।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক ।

 

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন