দেড় শতাধিক ত্যাগী নেতার প্রশ্ন, আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস কি শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
নজরুল ইসলাম আলীম:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে আন্দোলন, সংগ্রাম, কারাবরণ, নির্যাতন এবং আত্মত্যাগের অসংখ্য অধ্যায়। বিশেষ করে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির নেতাকর্মীদের ওপর নেমে এসেছে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, গুম-আতঙ্ক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের এক দীর্ঘ ছায়া। সেই কঠিন সময়ে রাজপথে যেসব নেতা দলের পতাকা উঁচিয়ে রেখেছিলেন, কর্মীদের সাহস জুগিয়েছিলেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার লড়াই করেছিলেন—তাদের অনেকেই আজ দলীয় কাঠামোর বাইরে অবস্থান করছেন।তারা কেউ এখন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নন, কেউ কোনো অঙ্গসংগঠনের দায়িত্বে নেই, আবার কেউ কেউ কেবল ‘সাবেক নেতা’ পরিচয় নিয়েই রাজনৈতিক জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, পদ-পদবী হারিয়ে গেলেও তারা দল হারাননি। বিএনপির প্রতি তাদের আনুগত্য, আদর্শের প্রতি বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এখনও অটুট রয়েছে। তাদের অনেকেই আজও প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, কর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং সংগঠনের স্বার্থে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত দেড় শতাধিক ত্যাগী নেতা বর্তমানে কোনো সাংগঠনিক পদে নেই। অথচ আন্দোলন-সংগ্রামের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে তারাই ছিলেন সামনের সারির নেতৃত্ব। তাদের আহ্বানে রাজপথ মুখরিত হয়েছে, তাদের নেতৃত্বে কর্মীরা মামলা-হামলা উপেক্ষা করে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, আর তাদের সাহসিকতায় সংগঠন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থেকেছে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দলের জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকারকারী এই নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন কতটুকু হয়েছে?একসময় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী বহু নেতা আজ পদহীন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস পদবীর চেয়ে অনেক বড়। কারও বিরুদ্ধে রয়েছে কয়েক ডজন মামলা, কেউ বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, কেউ আত্মগোপনে থেকে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেছেন। অনেকের পেশাগত জীবন ধ্বংস হয়েছে,ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবুও তারা রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বরিশালের বাকেরগঞ্জের কৃতি সন্তান লায়ন নুরুল ইসলাম খান মাসুদ ,যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মরতাজুল করিম বাদরু, সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি আবদুল খালেক হাওলাদার, সাবেক মহানগর নেতা গোলাম মাওলা শাহিন, আলী আকবর চুন্নু, ইউসুফ বিন জলিল কালু, গোলাম রাব্বানী, তরিকুল ইসলাম বনি, অ্যাডভোকেট আবু সেলিম চৌধুরী, শহীদ উল্লাহ তালুকদার, রুহুল আমিন আকিল, জাকির হোসেন সিদ্দিকী, জাকির হোসেন নান্নুসহ অসংখ্য নেতা আজও দলের জন্য সক্রিয় থাকলেও সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই আড়ালে রয়েছেন।বিশেষভাবে গোলাম মাওলা শাহিনের রাজনৈতিক জীবন এ বাস্তবতার একটি প্রতীকী উদাহরণ। ছাত্রদল থেকে যুবদল পর্যন্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারিতে ছিলেন। মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক হয়রানি সত্ত্বেও তিনি দল ও আদর্শের প্রতি অনড় থেকেছেন। একইভাবে আরও বহু নেতা রয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—তারা প্রতিকূল সময়ে দল ত্যাগ করেননি।বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে পদ-পদবী গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কখনও একজন নেতার প্রকৃত অবদান নির্ধারণ করে না। বরং সংকটের সময় একজন নেতা দলের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেটিই তার রাজনৈতিক মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। বিএনপির এই পদহীন নেতাদের অনেকেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন বহু আগেই।রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন,দীর্ঘআন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নেতৃত্ব একটি রাজনৈতিক দলের অমূল্য সম্পদ। তাদের রয়েছে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার বাস্তব অভিজ্ঞতা। নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। ফলে তাদের অবহেলা করা শুধু ব্যক্তিগতভাবে অন্যায় নয়, সাংগঠনিকভাবেও ক্ষতিকর।দলীয় অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ত্যাগী নেতাদের বিষয়ে অবগত রয়েছেন। দলের পুনর্গঠন, সাংগঠনিক সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় এসব নেতার ভূমিকা ও অবদান মূল্যায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এসব নেতার মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।তবে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন পদ-পদবী না থাকায় অনেক নেতার মধ্যে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। যারা একসময় হাজার হাজার কর্মীর নেতৃত্ব দিয়েছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অনেকেই এখন সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান করছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত হতাশার বিষয় নয়; বরং দলের অভ্যন্তরে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, বিএনপি যদি আগামী দিনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চায়, তাহলে দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতাদের অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে মূল্যায়ন করার বিকল্প নেই। কারণ রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে যারা ঝড়ের মধ্যে পতাকা ধরে রাখেন, তারাই প্রকৃত অর্থে একটি দলের শক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেন।আজ বিএনপির এই পদহীন কিন্তু সক্রিয় নেতারা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা বা রাজনৈতিক পুরস্কারের জন্য অপেক্ষা করছেন না। তারা অপেক্ষা করছেন স্বীকৃতির—দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন ও আনুগত্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির। তারা বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক ইতিহাস কখনও ত্যাগকে বিস্মৃত করে না। সময়ের ব্যবধানে হয়তো অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়, কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের অবদান ইতিহাসের পাতায় অম্লান থেকে যায়।সেই কারণেই বিএনপির দুঃসময়ের এই যোদ্ধারা এখনও রাজপথ ছাড়েননি, দল ছাড়েননি, আদর্শ ছাড়েননি। তাদের চোখে এখনও একটি স্বপ্ন—একদিন দল তাদের অবদানকে মূল্যায়ন করবে, অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবে এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দেবে।
এখন দেখার বিষয়, বিএনপির আগামী দিনের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও নেতৃত্ব বিন্যাসে এই ত্যাগী নেতাদের জন্য কতটা জায়গা তৈরি হয়। কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় পদ পরিবর্তনশীল হলেও ত্যাগের ইতিহাস চিরস্থায়ী। আর সেই ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আজও স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছেন বিএনপির দুঃসময়ের দেড় শতাধিক নেতা।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: