শিবগঞ্জ ইউএনওর মানবিক উদ্যোগ: বাল্যবিয়ে রোধ করে ৬ষ্ঠ শ্রেণির 'সামিরা'কে স্বপ্নের পথে ফেরালেন
বিশেষ প্রতিনিধি:
চারপাশের নানা অসঙ্গতি, বাল্যবিয়ে ও অশুভ সংবাদের ভিড়ে কিছু আলো ছড়ানো ঘটনা সমাজকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। এমনই এক ইতিবাচক ও মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তাঁর সময়োচিত পদক্ষেপ কেবল একটি জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেনি, বরং সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছে আশার বার্তা—ভালো কাজের প্রশংসা না করলে ভালো মানুষ তৈরি হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
সাহসী পদক্ষেপ ও স্বপ্নের উদ্ধার:
ঘটনার সূত্রপাত শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের এক কিশোরীকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী 'সামিরা' (ছদ্মনাম)—যার চোখে বড় হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার অদম্য স্বপ্ন। অথচ পরিবার তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বাল্যবিয়ের আয়োজন করছিল। কিন্তু হার মানেনি সামিরা। নিজের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন বাঁচাতে সে সোজা হাজির হয় ইউএনও দপ্তরে; আকুতি জানায় পড়ার সুযোগটুকু বাঁচিয়ে রাখার।
মেয়েটির চোখে অদম্য স্পৃহা আর দেশসেবার তীব্র ইচ্ছার কথা শুনে মন গলে যায় ইউএনও মহোদয়ের। তিনি কালবিলম্ব না করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং সামিরার বাবা-মাকে অফিসে তলব করেন। তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, এ বয়সে বিয়ে নয়, বরং মেয়েটির পড়ার সুযোগ পাওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। ইউএনওর ভালোবাসাপূর্ণ ও যুক্তিনির্ভর কাউন্সেলিংয়ে ভুল বুঝতে পেরে বাবা-মা মেয়েকে এখনই বিয়ে না দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামিরাকে নতুন বই, খাতা, স্কুল ব্যাগসহ উপহার দেওয়া হয় নগদ আর্থিক সহায়তা।
ইউএনও মহোদয়ের সেই ভাইরাল স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো:
"তার নাম সামিরা (ছদ্মনাম)। বাসা শ্যামপুর, ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সে অফিসে এসে আমাকে জানালো তার পরিবার তাকে বিয়ে দিতে চায়, কিন্তু সে বাল্যবিবাহ করবে না। সে পড়াশোনা করে পুলিশ হতে চায়। আমি তার পরিবারকে অফিসে ডেকে আনলাম; একই সাথে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকেও ডেকে আনলাম। তার পরিবারকে বোঝানো হলো। সামিরার জন্য বই, ব্যাগ, পোশাক ইত্যাদির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। তার পরিবার তাকে এখনই বিয়ে দেবে না মর্মে আমাকে জানালেন। সামিরা যেন পড়াশোনা করে তার ইচ্ছা পূরণ করতে পারে, এই জন্য প্রশাসন তার পাশে থাকবে।"
একটি সৎ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ কীভাবে একটি স্বপ্নের পথ মসৃণ করতে পারে, শিবগঞ্জের এই ঘটনাই তার উজ্জ্বল প্রমাণ। আশা করি, সামিরা একদিন সত্যি সত্যিই একজন দক্ষ ও গর্বিত পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে এ দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সেদিন এই মানবিক কর্মকর্তার হৃদয়ও ভরে উঠবে এক পরম তৃপ্তিতে।
মিজান উর রহমান
সহযোগী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক,
দৈনিক পুনরুত্থান।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান / মিজান উর রহমান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: