• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

দুই হাত নেই তো কী হয়েছে! পা দিয়ে লিখে দাখিলে উত্তীর্ণ আশরাফ


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:৪৪ পিএম;
দুই হাত নেই তো কী হয়েছে! পা দিয়ে লিখে দাখিলে উত্তীর্ণ আশরাফ

জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি:

 

দুটি হাত নেই, তবুও থেমে থাকেনি জীবনের দুর্নিবার লড়াই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পা দিয়ে লিখে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ২.৭৫ অর্জন করেছেন সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ১৮ বছর বয়সী তরুণ আশরাফ মো. আলী হোসেন।

আশরাফ জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পানিছড়া গ্রামের খলিল আহমদ ও মোছা. আমিনা বেগম দম্পতির ছেলে। তিনি সিলেটের চান্দু শাহ্ জামিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবারের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুই বছর আগে ২০২৪ সালে দাদির সঙ্গে কানাইঘাটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান আশরাফ। সেখানে দুইতলা ভবনের ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার সময় নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি ১১ কেভি লাইনের একটি বৈদ্যুতিক তার ধরে ফেলেন। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন।

দ্রুত তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, বিদ্যুৎস্পৃষ্টে তার দুটি হাতই মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে এবং জীবন বাঁচাতে হাত দুটি কেটে ফেলতে হবে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তার দুই হাতই কেটে ফেলতে হয়।

হাত হারানোর পর জীবনযাত্রার চিত্র পুরোপুরি বদলে যায় আশরাফের। দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে পড়াশোনা—সবকিছুর জন্যই তাকে অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে মনের জোর হারাননি তিনি। পা দিয়ে লেখা রপ্ত করেন এবং নিয়মিত মাদ্রাসায় যাতায়াত করে পড়াশোনা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে সফলভাবে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

নিজের কষ্টের দিনগুলোর কথা জানিয়ে আশরাফ বলেন, ‘আমি হাঁটাহাঁটি ও চলাফেরা করতে পারি। কিন্তু লেখাপড়া করতে মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় অনেকেই আমাকে অবহেলা করে গাড়িতে তুলতেন না। সঙ্গে একজন সহকারী না থাকলে চলাফেরা করা কঠিন হতো। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে আমি সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চাই।’

চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় পরিবারটি আজ সর্বস্বান্ত। আশরাফের বাবা একজন নিম্ন আয়ের মানুষ। চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে কিছুদিন আগে আশরাফের বড় ভাইও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা বাবার ওপর ভরসা করার অবস্থা না থাকায় এখন পরিবারের হাল ধরতে চান আশরাফ। নিজের ও পরিবারের আর্থিক সংকট বিবেচনা করে একটি সরকারি বা বেসরকারি কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট মহলের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

আশরাফের মামা মুহিব উল্লাহ বলেন, ‘দুর্ঘটনার পরও আশরাফ হার মানেনি। সে একজন অত্যন্ত মেধাবী ও লড়াকু ছাত্র। সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে সে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, আশরাফদের বাড়ির কাছেই ‘সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড’-এর প্রধান কার্যালয় রয়েছে। সেখানে যদি তার একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়, 
তবে বাড়ি থেকে যাতায়াত করে সে স্বাবলম্বী হতে পারত।

চিকনাগুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, ‘একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এই পরিবারটিকে অসহায় করে তুলেছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের বিত্তবান ও সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন