• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

বাসে ১০ টাকার ভাড়া ২০, ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা আদায়


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:১৪ পিএম;
বাসে ১০ টাকার ভাড়া ২০, ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গণপরিবহনের ভাড়া সমন্বয়ের সরকারি সিদ্ধান্ত এলেও এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এর মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন পথে যাত্রীদের কাছ থেকে আগের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীদের ভাষ্য, ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা, ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা। চালকেরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কথা বললেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের পক্ষে কোনো সরকারি কাগজ দেখাতে পারছেন না বাসে।

সাভার থেকে টেকনিক্যাল পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করেন ফারজানা আহমেদ। মঙ্গলবার তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগে এ পথে ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ভাড়া বেড়েছে ৫০ শতাংশ। ইসলামপুর যেতে আগে ৬০ টাকা দিতে হলেও এখন ৮০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। গত দুই দিন ধরে তেলের দাম বাড়ার কথা বলে এভাবে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

বলিয়াপুর থেকে প্রতিদিন কোরিয়ার টেকনিক্যাল মোড়ে আসেন শিক্ষার্থী মো. আশফাক রহমান। তিনি বলেন, আগে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও আজ ২০ টাকা নেওয়া হয়েছে। চালকেরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। আমরা স্টুডেন্ট ও গরিব মানুষ। এখানে পড়তে আসি। এখন যদি এভাবে ভাড়া বেড়ে যায়, আমরা কীভাবে চলব? তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে তো কোথাও তেলের দাম বাড়ে না।

যাত্রীদের অভিযোগের হিসাবেও বাড়তি ভাড়ার চিত্রটি স্পষ্ট। ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা হলে ভাড়া বেড়ে যায় ১০০ শতাংশ। ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা হলে বাড়ে ৫০ শতাংশ। আর ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা হলে ভাড়া বাড়ে ৩৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, সরকারি নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই কোনো কোনো রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত পুরোনো ভাড়ার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাস স্টপেজ ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বাসচালকেরা। শুভযাত্রা পরিবহনের চালক মো. তুহিন মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের ভাড়া বাড়েনি। কিন্তু তেলের দাম বাড়ায় আপ-ডাউন ট্রিপে আমাদের তেল কিনতে ২ হাজার টাকা বেশি লাগছে। আমাদের আপ-ডাউন ট্রিপে ৫০ লিটারের মতো তেল লাগে। আমরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছি না। বাড়তি ভাড়া চাইলে গেঞ্জাম সৃষ্টি হয়। সরকার যদি সিদ্ধান্ত দেয়, আমরা বাড়াব।

ভাড়া বাড়ল কিলোমিটারে ১৭ পয়সা

যাত্রীদের অভিযোগের মধ্যেই সরকার ডিজেলচালিত সাধারণ বাসের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দূরপাল্লা ও মহানগরসহ শহরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাধারণত জ্বালানি তেলের দাম এক টাকা বাড়লে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি এক পয়সা বাড়ে। এবার ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তা কমিয়ে ১৭ পয়সা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর বিআরটিএর সদর দপ্তরে বাসের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সেখানে মালিকরা কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তবে কমিটির আলোচনায় এর চেয়ে কম হারে, অর্থাৎ ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। পরে মন্ত্রণালয় ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়।

নতুন ভাড়া নির্ধারণের সময় ৫২ আসনের বড় বাস ও ৩০ আসনের মিনিবাসের হিসাব ধরা হয়েছে। তবে দূরপাল্লার অনেক পরিবহনে যাত্রীদের আরাম নিশ্চিত করতে ৫২ আসনের বাসের আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে আসনসংখ্যা কমানো বাসের ক্ষেত্রে ভাড়ার পরিমাণও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, দূরপাল্লা ও শহরের বিভিন্ন রুটে দূরত্ব অনুযায়ী নতুন ভাড়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। তালিকা প্রস্তুত করে প্রকাশ করতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে।

কত থেকে কত হবে ভাড়া

বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা। ১৭ পয়সা বৃদ্ধির পর তা দাঁড়াবে ২ টাকা ৭০ পয়সায়। মিনিবাসের বর্তমান ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হবে ২ টাকা ৫৯ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা। নতুন হার কার্যকর হলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ২ টাকা ৪০ পয়সা।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়।

তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাসের ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা করছেন যাত্রীরাও। তালহা জনি নামের এক যাত্রী ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে বাসের ভাড়া আরও বাড়তে পারে। আগে শিক্ষার্থীরা কম ভাড়ায় চলাচল করতে পারলেও এখন সর্বনিম্ন বাসভাড়াই ১০ টাকা। অল্প দূরত্ব গেলেও ১০ টাকা দিতে হয়। তেলের দাম বাড়ায় এই ভাড়া আরও বেড়ে ২০ টাকা হতে পারে।

তিনি বলেন, রিকশাচালক ও বাসচালকদের বলতে শুনেছেন, তেলের দাম বাড়লে তারা ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন। ১০ জন যাত্রী না উঠলেও পাঁচজন উঠবে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।

বাড়তি ভাড়া নিলে রুট পারমিট বাতিল

সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নিলে সংশ্লিষ্ট বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মেথড অনুযায়ী ২০ পয়সা বাড়ে। এর কম তারা (বাস মালিক সমিতি) মানতে চায়নি। মেইনটেন্যান্স কষ্টের কথাও বলছে তারা। দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর তাদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়বে বলে নির্ধারিত হয়েছে। যে-কোনো ভাড়া বাড়লে জনগণের ওপর চাপ। তবে সবকিছু বিবেচনায় যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছি বলে মনে করি।

মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনা করলে রাষ্ট্রকে সমন্বয় করতে হয়। তবে নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিলে রুট পারমিট বাতিল হবে। রেলের ভাড়া এখনো বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে না। তবে পরশুদিন রেল ও লঞ্চ নিয়ে বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হবে। লঞ্চে ভাড়া বাড়ানোর দাবি আছে।

৮-১০ পয়সা বাড়ালেই সমন্বয় সম্ভব

সরকার নির্ধারিত ১৭ পয়সা বৃদ্ধির বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রুট বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, দূরপাল্লায় ৮ পয়সা ও সিটি সার্ভিসে ১০ পয়সা বাড়ালেই বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ভাড়া পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে যাত্রীসাধারণের প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে বাস ও লঞ্চ মালিকদের নিয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, জনস্বার্থের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার পরিবর্তে লুকোচুরি করা হচ্ছে। কত টাকা পরিচালন ব্যয় বেড়েছে এবং কত পয়সা ভাড়া বাড়ালে সেই ব্যয় সমন্বয় করা সম্ভব, তার কোনো স্বচ্ছতা প্রকাশ করা হচ্ছে না। বিগত সরকারের সময় থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির একচেটিয়া সুবিধা বাস ও লঞ্চ মালিকদের দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের বৃহত্তর অংশীজন যাত্রীসাধারণের প্রতিনিধিদের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে কোনো মতামত নেওয়া হয় না। এর ফলে সাধারণ মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন