মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রাণ দিয়েই মূল্য চুকালেন সাগর
মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। একজন সাধারণ টাইলস মিস্ত্রি হয়েও বিশ্বাস করতেন—সমাজকে ভালো রাখতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু সেই সাহসের মূল্য তাঁকে দিতে হলো নিজের জীবন দিয়ে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মাদক বিক্রিতে বাধা দিতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হওয়া টাইলস মিস্ত্রি সাগর অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। প্রায় ১৮ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৩ জুন বিকেলে রায়পুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় একটি কারখানায় গাঁজার প্যাকেট করা হচ্ছিল। সাগর ঘটনাটি দেখে প্রতিবাদ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নুরুল আমিন ওরফে নুরুল্লা প্রকাশ্যে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে।
সাগরের চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে এসে অভিযুক্তকে আটক করেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গুরুতর আহত সাগরকে প্রথমে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সাগরের স্থায়ী বাড়ি চাঁদপুরে হলেও প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি স্ত্রী জান্নাত আক্তার, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে রায়পুরের ১০ নম্বর ইউনিয়নের নূরানী মাদ্রাসা সংলগ্ন শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন। পেশায় ছিলেন একজন পরিশ্রমী টাইলস মিস্ত্রি। সীমিত আয় হলেও সন্তানদের ভালো শিক্ষার জন্য তিনি কোনো কার্পণ্য করেননি। তাঁর ছেলে রাছেল রায়পুর আদর্শ শিশু নিকেতনের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে ইকরা একই প্রতিষ্ঠানের প্লে শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
আজ সেই দুই শিশুর মাথার ওপর থেকে সরে গেছে বাবার স্নেহের ছায়া। স্ত্রীর চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তার অন্ধকার। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
সাগরের দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় রায়পুর পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুব সংগঠন তাঁর চিকিৎসার জন্য সহায়তা তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হওয়ার দিনই আসে হৃদয়বিদারক খবর—সাগর আর নেই।
নিহতের শাশুড়ি এ ঘটনায় বাদী হয়ে রায়পুর থানায় মামলা করেছেন। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানিয়েছেন, এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত চলছে।
সাগরের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁদের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আর কোনো নিরীহ মানুষ যেন প্রাণ না হারায়। অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
একজন সাগরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে কেড়ে নেয়নি; দুই শিশুর শৈশব, এক স্ত্রীর স্বপ্ন এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সাগর আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর সাহসী প্রতিবাদ সমাজকে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে—মাদকের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়াবে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত?
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: