• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

কিশোর গ্যাং আর সোশ্যাল মিডিয়া অপরাধের নতুন দুনিয়া


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:০৪ পিএম;
কিশোর গ্যাং আর সোশ্যাল মিডিয়া অপরাধের নতুন দুনিয়া

কিছু কিছু মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। সেই মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠাও কঠিন হয়ে পড়ে।

অপ্রতিমের মৃত্যু তেমনি একটি ঘটনা। তেরো বছরের একটি শিশুকে হত্যা করেছে কয়েকজন দুর্বৃত্ত, তারা কিশোর। এই কিশোরদের লেখাপড়া করার কথা, খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা, মানুষের মতো মানুষ হওয়ার কথা। কিন্তু তারা কেন ঘাতক হলো, কেন বিপদগামী হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা এখন অত্যন্ত জরুরি।
আমরা যদি অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ করি তাহলে কিশোর গ্যাং ও সোশ্যাল মিডিয়ার যোগসূত্র সহজেই বুঝতে পারব। মায়ের আইফোন নিয়ে অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তেরো বছরের সন্তানের হাতে কেন আইফোন তুলে দিলেন মা? কেন তিনি জানতে চাইলেন না, তার বন্ধু কারা? কেবল অপ্রতিমের মা একা নন, আমরা অনেকেই এই সর্বনাশ করছি আমাদের সন্তানদের।

বাংলাদেশে অপরাধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত এক বছরে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।

এই সময়ে যতগুলো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তার মধ্যে শিশু হত্যা এক-তৃতীয়াংশ। আবার এই সময়ে যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার বেশির ভাগই কিশোর গ্যাং সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত। এই দুটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের শিশুরা যেমন ক্রমে অনিরাপদ হয়ে পড়ছে; তেমনি কিশোর গ্যাং হয়ে উঠছে অপরাধের মূল উৎস। মৃত্যু অথবা ঘাতক—এই দুই পথই এখন শিশুদের।
সম্প্রতি কিশোর অপরাধীদের অপরাধের কারণ বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় সব কিশোর অপরাধী সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত।

সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরেই তারা অপরাধজগতে প্রবেশ করেছে। এই অপরাধীদের গড় বয়স আঠারো বছরের নিচে, অথচ এরা একেকটি এলাকায় খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, মাদক সেবন, অপহরণ ইত্যাদির মতো বিভিন্ন অপরাধের মূল হোতা। এই অপরাধী কিশোর-তরুণরা পাড়ায়-মহল্লায় চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম অপরাধের সঙ্গে খুব সহজেই জড়িয়ে যাচ্ছে।
এলাকার স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরী-তরুণীদের উত্ত্যক্ত করছে, এমনকি ধর্ষণ ও হত্যার মতো বড় অপরাধও ঘটাচ্ছে। এরা এলাকার ছিন্নমূল শিশুদের ওপরও নির্যাতন করছে, কখনো কখনো তাদের দিয়ে মাদক আনা-নেওয়া করাচ্ছে। এদের অপরাধের জন্য যদি অভিভাবকদের কাছে কেউ নালিশ করেন, তাহলে উল্টো আরো বেশি হয়রানি ও হামলার শিকার হতে হয়। এদের শেল্টার বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এদের কাজে লাগানো হয়। এলাকায় প্রভাব সৃষ্টি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন—এসবের কাজে এরা নেতাদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

যে বয়সে ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে কিংবা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে কিশোরদের একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকে। এই সোশ্যাল মিডিয়াই আসলে কিশোর গ্যাংয়ের জনক। দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘিরে গড়ে উঠছে ভয়ংকর ‘কিশোর গ্যাং’। আধিপত্য বিস্তারে মারামারি, নেশা, শোডাউন, ইভ টিজিংসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে একশ্রেণির কিশোর। আর এসব অপরাধের অর্থের জোগানে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, চুরিসহ নতুন অপকর্মে জড়াচ্ছে তারা। ‘ক্ষমতা জানান দিতে’ ঘটছে খুনের ঘটনাও। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থে স্থানীয় প্রভাবশালীরা উঠতি বয়সী এসব তরুণকে বিভিন্ন সময় আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব গ্যাং এখন সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম।

আমাদের শিশু কিশোররা এখন এক ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের বিকাশে এখন সবচেয়ে বড় বাধার নাম সোশ্যাল মিডিয়া। ছোট শিশুদের হাতে আমরা বইয়ের বদলে তুলে দিচ্ছি স্মার্ট ডিভাইস। শিশুরা আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইলে। যা খুশি দেখতে পারছে অবাধে। লেখাপড়া, খেলাধুলার বদলে সারাক্ষণ তাদের চোখ ডিভাইসে। এটা একদিকে যেমন তার মানসিক বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে তার নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিশোর বয়সে এসে মোবাইল তাকে মাদকে আসক্ত করছে, কিশোরদের প্রলুব্ধ করছে সহিংসতায়। মোবাইল ডিভাইসে অশ্লীল কনটেন্ট দেখে কিশোররা ইভ টিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একসময় কিশোর বয়সেই তারা ফেসবুক আর টিকটকের কারণে হয়ে যাচ্ছে কিশোর গ্যাং। এভাবেই একটার পর একটা প্রজন্ম চলে যাচ্ছে বিপথে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের শিশু কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

‘আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলা’ এ রকম ঘটনার খবর আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি। হামলায় কিশোর নিহতের খবরও নতুন নয়। প্রতিটি হামলার ঘটনায় থাকছে সর্বনিম্ন ৩০-৪০ জনের একটি সংবদ্ধ কিশোর দল। কোথায়ও কোথাও হামলায় শতাধিক কিশোরও দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন মুহূর্তে এত কিশোর একসঙ্গে জড়ো হচ্ছে কিভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বেড়িয়ে এলো ভয়ংকর তথ্য! কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রত্যেক হামলার পেছনেই ব্যবহার হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইমোতে গ্রুপ খুলে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে থাকা গ্রপের অন্য সদস্যদের কাছে। যার ফলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তারা এক জায়গায় জড়ো হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উন্মুক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সেখানে নানা ধরনের আচরণ ও কার্যকলাপ শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। প্রতারণা ও হয়রানি ঝুঁকির পাশাপাশি শিশুরা অনলাইন বুলিংয়েরও শিকার হয়।

আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক শিশুদের আবদারপূরণ ও ‘বিরক্ত করা’ থেকে বাঁচতে শিশুদের হাতে মুঠোফোন তুলে দেন। অনেক সময় তাদের খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ‘ঝামেলা’র শর্টকাট সমাধানের জন্য মুঠোফোন হাতে তুলে দেওয়াই স্বস্তিকর। এটি হয়তো সাময়িক একটি সমাধান; কিন্তু এটিই শিশু-কিশোরের মারাত্মক আসক্তি তৈরির সুযোগ করে দেয়, যা তাকে ভবিষ্যতে এমন একটি জালে আটকে দেয়, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন।

সারা বিশ্ব শিশুদের সুরক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ক্রমবর্ধমান কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া।

সম্প্রতি বাল্যবিবাহ নিয়ে কাজ করা একটি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। অন‍্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নারী বিশেষ করে কিশোরীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। কিশোরদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের অশ্লীল ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২০৯টি।

আমাদের শিশু কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। খেলাধুলাতেও আগ্রহ কমে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়া কেড়ে নিচ্ছে আমাদের শিশু-কিশোরদের জীবনীশক্তি। এই বিষয়টি আমরা যত উপেক্ষা করব, সমস্যা ততই ঘনীভূত হবে। অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের হাতে কলমে দেখিয়ে দিল শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া কতটা বিপজ্জনক। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে আনতে শিশু-কিশোরদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশ এরকম পদক্ষেপ নিয়েছে।

তাই একমুহূর্ত দেরি না করে এখনই সোশ্যাল মিডিয়াকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের প্রাণ অকালে ঝরে যাক, সেটা যেমন আমরা চাই না, তেমনই শিশু-কিশোররা যেন ঘাতক না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন