স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান দুর্যোগের দায় অন্তর্বর্তী সরকার এড়াতে পারে না
- ডা. মুশতাক হোসেন
স্বাস্থ্য মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই স্বাস্থ্যের সেবাটা দরকার। স্বাস্থ্য শুধু রোগের চিকিৎসার জন্যই নয়, একটা মানুষকে সুস্থ রাখার জন্য যে কাজ সেটা স্বাস্থ্যসেবার কাজ। এটা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ না, এর সঙ্গে প্রায় ৩০টির মতো মন্ত্রণালয় জড়িত। আমাদের স্বাস্থ্যসেবাকে একটি সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক ধারণা থেকে দেখা উচিত।
কিন্তু আমরা এখনো মনে করি, হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসাটাই হলো স্বাস্থ্যসেবার সব। ফলে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সারা বাংলাদেশকে হাসপাতালে পরিণত করলেও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি ঠেকাতে না পারলে মানুষকে সুস্থ রাখা সম্ভব নয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন জনস্বাস্থ্যভিত্তিক অনেক ভালো প্রস্তাব দিয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন।
চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে সুপারিশ তো ছিলই। কিন্তু ওই সরকার সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাঁচটি উপাদান রয়েছে—১. রোগ প্রতিরোধ, ২. স্বাস্থ্য উন্নয়ন, ৩. চিকিৎসা (যাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার হৃৎপিণ্ড বলা হয়), ৪. পুনর্বাসন (সুস্থ হওয়ার পর রোগীকে দেওয়া প্রয়োজনীয় সহায়তা) এবং ৫. উপশমমূলক সেবা বা প্যালিয়েটিভকেয়ার (দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তদের বেদনাবিহীন জীবনযাপনের সহায়তা)। এগুলো একসঙ্গে করে আমরা যদি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন না করি, শুধুমাত্র রোগ হলো, হাসপাতালে রোগীর চাপ হলো এবং রোগীকে সুস্থ করার জন্য ওষুধের, হাসপাতালের ও ডাক্তারের পেছনে দৌড়াতে থাকি, সেই দৌড় কখনো আমরা কিন্তু শেষ করতে পারব না।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, বর্তমানে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। সবাই ঢাকায় থাকতে পছন্দ করে, ঢাকাতেই সব সমাধানের আশা করে। অর্থনীতির বড় বড় কেন্দ্রও এখানে। কিন্তু ঢাকাতেও স্বাস্থ্যসেবার নিরাপত্তা পাওয়া যাচ্ছে না, নিরাপদ থাকছে না। সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় ঢাকার হাসপাতালগুলো ওভারফ্লো হয়ে যাচ্ছে।
আজ দেখুন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের অবস্থা। এখানে সক্ষমতার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি শিশু রোগী চলে এসেছে। সামর্থ্য না থাকায় সব রোগী আসতেও পারছে না। এখানেও সক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী হওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা ছাড়াও রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়বে। এখন যেমন হাম হচ্ছে। যেসব হামের রোগী ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বা বড় শহরগুলোর হাসপাতালে আসছে, সেসব রোগীর ঠিকানাগুলো ধরে শহরে হোক বা গ্রামে হোক— সেখানে আমাদের কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার, হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, এনজিওকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিয়ে প্রাথমিকভাবে আর কোনো আক্রান্ত আছে দেখতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের মাকেসহ হাসপাতালে আনতে হবে। এতে ওই শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে, অন্যদিকে রোগটা ছড়াবে না।
বর্তমানে হামের যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তা মহামারির দিকে যাচ্ছে। এটি মোকাবেলায় দ্রুত তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। বর্তমান সরকার এরই মধ্যে এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে—১. দ্রুত টিকাদান; হামের টিকা বিদেশ থেকে কিনে এনে উপদ্রুত এলাকায় দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইপিআইয়ের অভিজ্ঞতা এবং এই প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবককে কাজে লাগানো প্রয়োজন। প্রয়োজনে তাঁদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। ভাতার ব্যবস্থা এখন না করা গেলেও তাঁরা সহযোগিতা করতে রাজি হবেন বলে আমার ধারণা। ২. চিকিৎসাব্যবস্থার দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এটা কভিডের সময় করা হয়েছিল। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যারা শ্বাসকষ্টে ভোগে, তাদের আইসিইউতে নেওয়ার আগে সঠিক নিয়মে অক্সিজেন দিলে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পদায়ন করা আছে। তবে উপজেলা পর্যায়ে বেশি রোগী না থাকার কারণে সিভিল সার্জন হয়তো তাঁদের জেলা হাসপাতালে রেখে দেন। প্রয়োজনে ওই সব চিকিৎসককে হাম আক্রান্ত এলাকার উপজেলা পর্যায়ে নিতে হবে। ৩. মাঠ পর্যায়ে নজরদারি : স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাম আক্রান্ত এলাকায় জ্বরে আক্রান্ত বা শরীরে লাল ছোপ থাকা শিশুদের খুঁজে বের করে উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। এ বিষয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত হয়। সরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে এ বিষয়ে সহায়তা দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা : সমন্বিতভাবে কাজ করলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা জিকা সংক্রমণের মতো সমস্যাগুলো সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগগুলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ম্যানেজ করলে অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মডেলের কথা বলা আছে। তো এই সার্বিক বিষয়টি সম্পর্কে সমন্বিত উদ্যোগ না নিয়ে আমরা যদি দু-একটা উপসর্গ নিয়ে জনতুষ্টিমূলক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি, তাহলে সমাধানের দিকে পৌঁছতে পারব না। সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাবে। এখনো সময় আছে। তালগোল পাকানোর আগেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক সংস্কারে হাত দেওয়া উচিত। সবচেয়ে আগে একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন এবং জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বারবার এ বিষয়ে একটি ব্যবস্থার কথা বললেও অন্তর্বর্তী সরকার তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে কিছু না করার কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ওই সরকারের দেড় বছর সময় ছিল, সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও ছিল। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, একটা ট্রানজিশনাল ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আজ হামের প্রাদুর্ভাবে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে অব্যবস্থা ও দুর্যোগের চিত্র ফুটে উঠেছে তার জন্য ওই সরকারও দায় এড়াতে পারে না। হাম প্রাদুর্ভাব থেকে মহামারির দিকে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের যে প্রস্তুাবগুলো রয়েছে তা অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। এখন যে কর্তৃপক্ষ আছে, তারা যদি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন করতেই পারত তাহলে তো সংস্কার করার প্রশ্নই আসত না। রুটিন কাজ করতেই বর্তমান কর্তৃপক্ষ গলদঘর্ম।
সরকার বলেছে হামের টিকা আনা হবে। এটা ভালো উদ্যোগ। বর্তমানে টিকার আমদানির ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ, টিকার আঞ্চলিক হাব দুবাইয়ের বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে, তাই জেনেভা, ম্যানিলা বা ব্যাঙ্কক থেকে দ্রুত টিকা আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার : হাম নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের জনবল সংকট মেটাতে তৃতীয় বর্ষের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী এবং বেকার চিকিৎসকদের ভলান্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া আইইডিসিআরের র্যাপিড রেসপন্স টিমের মাধ্যমে কন্টাক্ট ট্রেসিং করে রোগী খুঁজে বের করতে হবে।
ভবিষ্যতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা জিকা সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থায় দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে সরকার ও জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। হামের এই বর্তমান সংকটকে যদি সঠিকভাবে মোকাবেলা করা যায়, তবে সেই একই মডেলে ভবিষ্যতে অন্যান্য জনস্বাস্থ্য সমস্যাও সমাধান করা সম্ভব হবে।
লেখক : দেশের একজন বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: