ষাট শিল্পীর চোখে এক দুর্গা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে ঘিরে সারা দেশে এখন সাজ সাজ রব। কোথাও মণ্ডপসজ্জার ব্যস্ততা, কোথাও প্রতিমায় রং ও অলংকারের শেষ ছোঁয়া।
শনিবার মহালয়া। চণ্ডীপাঠ, মন্ত্রোচ্চারণ আর আগমনী সুরে সূচনা হবে দেবীপক্ষের। ধীরে ধীরে ঢাকের বাদ্য, কাঁসর আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপ।
শারদীয় উৎসবের আবহে রাজধানীর ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে দেখা গেল দেবী দুর্গাকে ঘিরে ভিন্নমাত্রিক রঙের এক মহাযজ্ঞ।
ষাটজন শিল্পী এঁকেছেন একই দেবীকে, তবে প্রত্যেকের ক্যানভাসে তিনি ভিন্ন। কারও তুলিতে শক্তি ও সাহসের প্রতীক, কারও রঙে মাতৃত্ব ও মমতার প্রতিচ্ছবি, আবার কারও রেখায় প্রতিবাদ, আত্মবিশ্বাস ও সমকালীন জীবনের নানা সংকেত। তাঁদের শিল্পকর্ম নিয়ে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী প্রদর্শনী ‘শিল্পীর চোখে দুর্গা’।
শক্তি শিল্পযাত্রার আয়োজনে এবং বিশ্বরঙের উদ্যোগে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় আজ শুক্রবার বিকেল ৪টায়।
প্রদর্শনী চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থী ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এটি। উদ্বোধনী আয়োজনে কোনো প্রধান বা বিশেষ অতিথি ছিলেন না।
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অনুপ্রাণিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে ওঠে মিলনমেলা। উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী দিলারা জামান, অভিনেতা আবুল হায়াত, সাংবাদিক সন্তোষ শর্মা, মডেল সাদিয়া ইসলাম মৌসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজন।
আয়োজকদের পক্ষে শিল্পী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা বিপ্লব সাহা বলেন, দেবী দুর্গা শুধু ধর্মীয় প্রতীক নন, মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিরও রূপক। এতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অন্ধকার ভেদ করে আলোর সন্ধান করা এবং সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে নতুন সম্ভাবনা গড়ে তোলার প্রেরণা পাওয়া যায়। বিভিন্ন বয়স, অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের শিল্পীরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই শক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশ ক্যানভাসে ধারণ করেছেন।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, শিল্পীরা নানা আঙ্গিকে ও নানা ভাবনায় তুলে ধরেছেন দুর্গাদেবীকে। একই দেবী, তবে দৃষ্টিভঙ্গির কত বৈচিত্র্য! বৈচিত্র্যই যেন প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ। একজন শিল্পীর চোখে দুর্গা কেমন, তার কাছে দেবীর শক্তি ও সৌন্দর্যের অর্থ কী, চিরপরিচিত প্রতীকের মধ্যে তিনি কীভাবে খুঁজে পান নতুন কোনো ভাবনা, শিল্পকর্মগুলো যেন সে প্রশ্নগুলোরই উত্তর দেয়।
দুর্গা বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি শিল্প, সংস্কৃতি ও সামষ্টিক চেতনার গভীর অনুষঙ্গ। পুরাণে তিনি অশুভ শক্তির বিনাশকারী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের প্রতীক। বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতিতে তিনি আবার ঘরের মেয়ে, মমতার আশ্রয়, আনন্দ ও মিলনের উপলক্ষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের কল্পনায় তা রূপ ও ব্যাখ্যা পেয়েছে।
‘শিল্পীর চোখে দুর্গা’ বহুমাত্রিক ব্যাখ্যারই শিল্পিত আয়োজন। এখানে দুর্গা শুধু আচার-অনুষ্ঠানের পরিচিত প্রতিমা নন; তিনি মানুষের ভেতরে থাকা সাহস, প্রতিবাদ, সৃজনশীলতা ও আশার প্রতীক। কোনো ছবিতে তাঁর অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভাষা, কোনো ছবিতে তাঁর মুখাবয়ব মমতা ও প্রশান্তির প্রতিচ্ছবি। কোথাও নারীর আত্মমর্যাদা, কোথাও মানুষের সংগ্রাম, আবার কোথাও অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা শিল্পীর তুলিতে রূপ পেয়েছে।
দুর্গাপূজার সঙ্গে বাংলার শিল্পের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলপনা, লোকশিল্প কিংবা আধুনিক চিত্রকলায় দেবীর রূপ বারবার নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে সমকালীন চিন্তার সংলাপ শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে, উৎসবের অভিজ্ঞতাকেও দিয়েছে নতুন মাত্রা।
প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন বীরেন সোম, রঞ্জিত দাস, নাইমা হক, জামাল আহমেদ, সৈয়দ জাহিদ ইকবাল, বিপ্লব সাহা, শেখ আফজাল, বিপাশা হায়াত, মানসী বণিক, রোকেয়া সুলতানা, সুকান্ত বণিক, কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ, কনকচাঁপা চাকমা, মনিরুজ্জামান, মোস্তফা খালিদ পলাশ, নিসার হোসেন, করু তিতাস, কিরিটি রঞ্জন বিশ্বাস প্রমুখ।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, শিল্পীদের নিজস্ব সৃজনশীলতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে দুর্গার বহুমাত্রিক উপস্থাপনা শিল্পপ্রেমীদের জন্য তৈরি করবে ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে শিল্প ও শারদীয় উৎসবের আবহের মধ্যে একটি নান্দনিক সংযোগ তৈরি করবে এই আয়োজন।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- ষাট শিল্পীর চোখে এক দুর্গা
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: