ঝাড়তলা–পাঁচুয়া হাজী বাজার (গঙ্গা) ঘাটে স্থায়ী সেতুর দাবিতে জনআকুতি
প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার; যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি। ব্রহ্মপুত্র নদের দুই তীরে অবস্থিত গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার ঐতিহাসিক পাঁচুয়া হাজী বাজার (গঙ্গার বাজার) এবং নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের ঝাড়তলা বাজার। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই জনপদের মাঝখানে থাকা ঝাড়তলা–পাঁচুয়া হাজী বাজার (গঙ্গা) ঘাটে আজও নির্মিত হয়নি একটি স্থায়ী সেতু। ফলে প্রতিদিন খেয়া নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে বাধ্য হচ্ছেন হাজারো মানুষ। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ বছরের পর বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহালেও তাদের দীর্ঘদিনের এই দাবি এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে শুধু যাতায়াতই নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দুই জেলার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এলাকাবাসীর ভাষায়, একটি সেতু বদলে দিতে পারে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতির চিত্র।
দুই পাশে সেতু থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুবিধা
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত সেতুস্থল থেকে উত্তরে প্রায় ২ কিলোমিটার এবং দক্ষিণে ২.৪ কিলোমিটার দূরত্বে নদী পারাপারের দুটি সেতু রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতিতে ওই দুটি সেতু এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না। অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হয়, সময় ও খরচ বেড়ে যায়। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর নির্জন পরিবেশের কারণে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাসেল (৩৪) বলেন,
> “আমাদের প্রধান যাতায়াত গঙ্গার বাজার ও ঝাড়তলা ঘাটকে কেন্দ্র করে। উত্তর ও দক্ষিণের সেতু ব্যবহার করতে অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হয়। আবার সন্ধ্যার পর নির্জনতার কারণে ওই সেতুগুলো দিয়ে চলাচল করাও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মানুষ খেয়া নৌকায় নদী পার হয়।”
লেবুতলা ইউনিয়ন যুবদলের সহ-সভাপতি ও প্রভাষক মো. শফিকুল ইসলাম জুলহাস (৩৯) বলেন,
> “সহজ ও নিরাপদ যোগাযোগ একটি এলাকার উন্নয়নের পূর্বশর্ত। গঙ্গার বাজার ও ঝাড়তলা বাজারের মাঝামাঝি একটি সেতু নির্মাণ হলে গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা থেকে মনোহরদীর লেবুতলা হয়ে সরাসরি ভৈরব ও কটিয়াদী পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প যোগাযোগ করিডোর তৈরি হবে। এতে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং দুই জেলার সামাজিক যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”
শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের আতঙ্ক
নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত লেবুতলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, তারাকান্দী উচ্চ বিদ্যালয় এবং আমতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন কাপাসিয়া এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসে। কিন্তু স্থায়ী সেতুর অভাবে তাদের একমাত্র ভরসা খেয়া নৌকা।
বর্ষাকালে নদী উত্তাল থাকলে কিংবা ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নৌকায় পারাপার করতে গিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা চরমে পৌঁছে। মাঝেমধ্যে দীর্ঘ সময় মাঝির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, ফলে শিক্ষার্থীদের সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছানোও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ঘাটে উপস্থিত ৬৫ বছর বয়সী এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “অনেক শিশু প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে স্কুলে যায়। মাঝেমধ্যে মাঝির জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষার সময় নদী উত্তাল থাকলেও নৌকায় উঠতে হয়। প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকেরা আতঙ্কে থাকেন। আর কতদিন এই দুর্ভোগ চলবে?”
অর্থনীতি ও চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং বাজারজাতকরণেও সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা।
অন্যদিকে জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও নৌকানির্ভরতা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় নৌকা না পেলে রোগীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় এই বিলম্ব রোগীর জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয় বলে জানান স্থানীয়রা।
সেতু নির্মাণ হলে যেসব সুফল মিলবে
- গাজীপুর ও নরসিংদীর মধ্যে নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
- মাওনা–লেবুতলা–ভৈরব–কটিয়াদী রুটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
- শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে যাতায়াতের অবসান ঘটবে।
- কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন সহজ হবে; কমবে সময় ও ব্যয়।
- জরুরি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হবে।
- দুই জেলার কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
- স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
জনআকাঙ্ক্ষা ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা
গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত ঝাড়তলা–পাঁচুয়া হাজী বাজার (গঙ্গা) ঘাটে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন আর শুধু একটি অবকাঠামোগত দাবি নয়; এটি হাজারো মানুষের নিরাপদ জীবন, শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসাসেবা এবং টেকসই আঞ্চলিক উন্নয়নের অপরিহার্য প্রয়োজন।
দৈনিক পুনরুত্থান-এর সঙ্গে কথা বলা এলাকাবাসী জানান, বছরের পর বছর ধরে তারা একটি স্থায়ী সেতুর অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় এবার তাদের দীর্ঘদিনের এই দাবিটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে—এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।
এলাকাবাসীর বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে যে অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছেন, তারই অংশ হিসেবে ঝাড়তলা–পাঁচুয়া হাজী বাজার (গঙ্গা) ঘাটে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি মানবিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করবেন।
একই সঙ্গে নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাব) আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জনাব সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল-এর প্রতিও এলাকাবাসীর বিশেষ প্রত্যাশা রয়েছে। তাদের আশা, তিনি স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের এই দাবিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের কাছে অগ্রাধিকারভিত্তিতে উপস্থাপন করে দ্রুত সেতু নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
স্থানীয়দের মতে, এই একটি সেতু নির্মিত হলে শুধু দুই জেলার মানুষের নিরাপদ যাতায়াতই নিশ্চিত হবে না; বরং শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জরুরি চিকিৎসাসেবা, সামাজিক যোগাযোগ এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
তাই এলাকাবাসীর জোরালো আহ্বান—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঝাড়তলা–পাঁচুয়া হাজী বাজার (গঙ্গা) ঘাটে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। হাজারো মানুষের বহুদিনের এই প্রত্যাশা যেন আর অপেক্ষার প্রহর না বাড়ায়।
দৈনিক পুনরুত্থান / বিশেষ প্রতিনিধি | দৈনিক পুনরুত্থান- কাপাসিয়া-মনোহরদী সীমান্ত
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: