• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:২৪ এএম;
প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়

সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তর বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা নাজুক, বাইরে থেকে তা বোঝা না গেলেও প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় বিষয়টি সামনে আসে। শুধু সীমানাপ্রাচীর উঁচু করে কাঁটাতারের বেড়া দিলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, এ ঘটনাই তার প্রমাণ।

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনা যে সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আমলে নিতে হবে বলে মনে করছেন সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের নিরাপত্তার জন্য শুধু বাইরে কড়াকড়ি হলেই হবে না, অভ্যন্তরে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদেরও মনিটরিংয়ে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা। জানা গেছে, ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুরো সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে মাঠে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

কিন্তু সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন, যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি হয়ে যায়, সেখানে অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর নিরাপত্তা কোথায়?

 

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী যে দপ্তরে অফিস করেন, যে দপ্তরে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান, সেই দপ্তর থেকে তার চুরি হতে পারলে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিষয়টি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আমলে নিতে হবে। এর আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না তা-ও তদন্ত করে দেখতে হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. হেলাল উদ্দিন জানান, সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তর সচিবালয়ে বাইরের সাধারণ মানুুষের প্রবেশাধিকার নেই।

সরকারের কার্ডধারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পাসধারী দর্শনার্থী ছাড়া অন্য কেউ সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারে না। রয়েছে শখানেক সিসিটিভি ক্যামেরা। ফলে অভ্যন্তরে কেউ কোনো ঘটনা ঘটাতে চাইলে তা শনাক্ত করা কঠিন কাজ নয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থায় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত, সেখানে তাঁদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি হলো, সেটি অবশ্যই প্রশ্নের জন্ম দেয়। শুধু তা-ই নয়, সচিবালয়ের অভ্যন্তরে স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেগুলোর ফুটেজ কেউ মনিটর করছে কি না, কিংবা এসবের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা আদৌ কোনো কাজ করছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা জরুরি।

জানা গেছে, সচিবালয়ের ভবনগুলোর চাবি সংরক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। অফিস ছুটির পর নির্দিষ্ট কর্মচারী সব ভবনে প্রবেশের সব গেট তালাবদ্ধ করেন। কিভাবে সেই তালা খুলে ঝাড়ুদার ছাদে গিয়ে তার নিয়ে সচিবালয় থেকে বেরিয়ে গেল তা কারো চেখে পড়ল না! বিষয়টি উদঘাটনে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ শুরু করেছে। এ ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীসহ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে এসব কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের তালিকা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

একই সঙ্গে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাইরে বিভিন্ন দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোয় কর্মরত মালিক-শ্রমিকদের ওপর নজরদারির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মরত পুলিশ সদস্য রেজাউল করিম জানিয়েছেন।

তিনি আরো জানান, সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন নামে একাধিক সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। তাঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে সচিবালয়ের বাইরের দপ্তরগুলো থেকে কর্মচারীদের সচিবালয়ের অভ্যন্তরে জড়ো করেন। এতে সচিবালয়ের নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ এই নেতাদের সঙ্গে বাইরের যে কেউ সহজে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারে।

এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের কাজে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তাঁরা কারা, তাঁরা কী নিয়ে কতবার সচিবালয় থেকে বের হচ্ছেন কিংবা প্রবেশ করছেন, তার হিসাবও কেউ রাখে না। তাঁদের কাজ কত ঘণ্টা, কখন তাঁরা সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাবেন, তারও কোনো টাইম শিডিউল নেই। এ বিষয়টিও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করছেন সচিবালয়ে কর্মরত একজন উপসচিব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় দেখি, সকাল ৯টার আগে একদল পরিচ্ছন্নতাকর্মী সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। তাঁরা কারা, কতজন প্রবেশ করার কথা, তাঁদের কাছে কার্ড আছে কি না, তাঁরা হাতে কী নিয়ে প্রবেশ করছেন আর কী নিয়ে বের হচ্ছেন তা-ও মনিটরিং করার কেউ নেই। বিষয়গুলো মনিটরিং করা হলে এমন ঘটনা না-ও ঘটতে পারত।’

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজনের একজন সচিবালয়ের আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্র (২৬) এবং ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলাম (৩২)। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।

পুলিশ জানায়, চুরি করা তামার তার ভাঙ্গারির দোকানে প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে। মোট আট কেজি ২০০ গ্রাম তামার তার বিক্রি করেন গ্রেপ্তার হওয়া আউটসোর্সিং কর্মী। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এই দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গত ১ জুন সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘রেড টেলিফোন’ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি নজরে আসে। গ্রেপ্তার রঞ্জন চন্দ্র গত ২২ মে সচিবালয়ের ছাদ ও বিভিন্ন ভবনের সংযোগস্থল থেকে প্রায় আট কেজি ২০০ গ্রাম তামার তার কেটে নিয়ে তা ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে দেন। পরে পুলিশ ও সিটিটিসি টিম তল্লাশি চালিয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলামের গুদাম থেকে ওই তামার তার উদ্ধার করে।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন