• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৫ আগষ্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০১:০৬ পিএম;
৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের পরও এই দীর্ঘ সময়ে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

বরং রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র হওয়ায় গত দেড়-দুই বছরে নতুন করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় ক্যাম্পে হতাশার পাশাপাশি বাড়ছে অপরাধ, মাদক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা। খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় কঠিন হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের জীবন।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিতে চাপ বাড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও।

এক প্রতিবেদনে বাংলা ট্রিবউন জানায়, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে রয়েছে আরো ৩৩ হাজার ৮১৯ জন। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি।

স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার তথ্যমতে, নতুন অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে সাড়ে সাত থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা স্থল ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জাতিসংঘ ওই দমন-পীড়নকে জাতিগত নিধনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে বর্ণনা করেছিল। এর আগে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার ঘটনা ঘটে। তবে ২০১৭ সালের ঢল ছিল সবচেয়ে বড় ও দ্রুততম।

নয় বছর পরও রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাঁশ ও ত্রিপলের ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার আগের চেয়েও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে অপরাধ, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে।


২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র হওয়ার পর নতুন করে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ ছাড়িয়েছে। অনেকে অনানুষ্ঠানিক ও গোপন পথে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। এতে আগে থেকেই জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরো বেড়েছে।

দীর্ঘ নয় বছরে ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। আরসা ও আরএসওসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘর্ষে সাধারণ রোহিঙ্গারা আতঙ্কে থাকছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা খুন হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগে আড়াই শতাধিক মামলা হয়েছে। ক্যাম্প থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, বিদেশি রাইফেল ও দেশি অস্ত্রও উদ্ধার হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অনুদান কমে যাওয়ায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক খাদ্য বরাদ্দ সাড়ে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ছয় ডলারে নামিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বরাদ্দ আরো কমলে নারী ও শিশুদের অপুষ্টি বাড়তে পারে। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও তার শতাধিক অংশীদার সংস্থা যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে।


গত নয় বছরে একাধিকবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, প্রত্যাবাসনের তালিকা ও পাইলট প্রকল্প নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। বাংলাদেশ কয়েক দফায় মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠায়। মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো নেই।

ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি—মিয়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজ গ্রাম ও ভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জুবাইর বলেন, শুধু তালিকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ বদলাবে না। নিরাপদে নিজের গ্রামে ফেরার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছরপূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ তৈরির পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

দীর্ঘ নয় বছরে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও শ্রমবাজারেও রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির প্রভাব পড়েছে। বসতি নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কারণে উখিয়া-টেকনাফের বনভূমির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পের বর্জ্যে কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপহরণ, মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে।


শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা যেখান থেকে বাংলাদেশে এসেছে, সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ফেরানো, মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নয় বছরেও একজন রোহিঙ্গা দেশে ফিরতে না পারায় সংকটটি এখন শুধু মানবিক নয়; বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন