মনোহরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়মের রাজত্ব, টিকিটে দ্বিগুণ ফি ও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে নানা অনিয়ম, দুর্ভোগ ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা—এমন অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দায়িত্ব পালনকালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, অনুপস্থিতির বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে হাসপাতালটির সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ‘দৈনিক পুনরুত্থান’-এর অনুসন্ধানী দল সরেজমিনে মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যায়। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগগুলোর বেশ কিছু বিষয়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র পাওয়া যায়।
হাসপাতালে পৌঁছে অনুসন্ধানী দল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএন্ডএফপিও) ডা. মো. রাশেদুল হাসান মাহমুদের কার্যালয়ে যায়। তবে তার কক্ষটি ফাঁকা পাওয়া যায়। সেখানে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা জানান, সকাল থেকে ডা. রাশেদ হাসপাতালে আসেননি এবং তারা সেদিন তাকে দেখেনওনি।
এরপর ডা. নীলা ইসরাক সুলতানার চেম্বারে গেলে তাকেও সেখানে পাওয়া যায়নি। তার সহকারী প্রথমে জানান, চিকিৎসক ওয়াশরুমে গেছেন। তবে চেম্বারের সঙ্গে ওয়াশরুম থাকা সত্ত্বেও তাকে দ্বিতীয় তলায় টিএসওর কক্ষের ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলা হয়। বিষয়টি যাচাই করতে সেখানে গেলে টিএসওর কক্ষ ফাঁকা পাওয়া যায় এবং ওয়াশরুমেও তালা ঝুলতে দেখা যায়।
এদিকে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বলে জানান। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ডা. নীলার অবস্থান জানতে চাইলে হাসপাতালের কর্মচারীরা একেক সময় একেক তথ্য দেন। কেউ বলেন তিনি নামাজে গেছেন, কেউ জানান পার্সেল আনতে বাইরে গেছেন, আবার কেউ দাবি করেন তিনি দ্বিতীয় তলায় মিটিংয়ে আছেন। দীর্ঘ সময় পর ডা. নীলা চেম্বারে ফিরলে তার অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় হাসপাতালের এক কর্মচারী সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং তাদের পেশাগত দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সকাল থেকে ডা. রাশেদের অনুপস্থিতির বিষয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে মিটিংয়ে থাকার কথা জানানো হয়। তবে মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওই দিন ডা. রাশেদ উপজেলা কার্যালয়ে যাননি এবং সেখানে কোনো মিটিংও ছিল না।
পরে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ডা. রাশেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি হাসপাতালেই মিটিংয়ে আছেন। সকাল থেকে তাকে হাসপাতালে না পাওয়া এবং ইউএনও কার্যালয়ে কোনো মিটিং না থাকার তথ্য জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ। এ সময় দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিককে ‘ধান্ধাবাজ’ বলে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগও উঠেছে।
অন্যদিকে, হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট নিয়েও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি নির্ধারিত ৫ টাকার পরিবর্তে রোগীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সেবাগ্রহীতারা। টিকিট কাউন্টারে টাকা আদায়কারী এক নারী হাসপাতালের অনুমোদিত কর্মচারী কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার প্রতিবাদ করলে রোগীদের ধমক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ওই নারীকে হাসপাতালের বাইরে একটি দোকানের দিকে সরে যেতে দেখা যায়।
চিকিৎসা নিতে আসা মিনার বেগম নামে এক সেবাগ্রহীতা বলেন, “কাউন্টারে থাকা লোকেরা খুব খারাপ আচরণ করে, কথা বলতে গেলেই ধমক দেয়।”
সানজিদা খাতুন নামে আরেক রোগী অভিযোগ করে বলেন, “ডা. নীলা ম্যাডামের কাছে আসলে তিনি হাসপাতালে ঠিকমতো না দেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে দেখালে ভালো হবে বলে পরামর্শ দেন।”
হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এই দম্পতির কারণে আমরা অতিষ্ঠ। যতবার বদলির আদেশ হয়, অলৌকিক ক্ষমতায় তারা তা আটকে দেয়। এখানে তারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে, এগুলো ফেলে তারা যেতে চায় না।”
হাসপাতালের সামনের এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা এই সিন্ডিকেটের বিদায় চাই, হাসপাতালে নতুন কর্মকর্তা আসুক।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে নরসিংদীর সিভিল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়ম, চিকিৎসকদের দায়িত্বে অনুপস্থিতি, টিকিট কাউন্টারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: