• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৫ আগষ্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে বরিশালের লাল শাপলার বিল


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:৩৪ এএম;
মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে বরিশালের লাল শাপলার বিল

ভোরের নরম আলোয় বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হয়, পানির ওপর যেন বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল ফুলের চাদর। কোথাও ছোট ছোট নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে, কোথাও সাদা বক কিংবা পানকৌড়ির আনাগোনা। পানির কলকল শব্দ, পাখির কলকাকলি আর চারপাশের নির্মল গ্রামীণ পরিবেশ মিলে তৈরি হয় এক অপূর্ব প্রাকৃতিক আবহ।

এ দৃশ্য বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিলের। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের উত্তর সাতলা গ্রামজুড়ে বর্ষা মৌসুমে জেগে ওঠে এই শাপলার রাজ্য। জুলাই থেকে শাপলা ফুটতে শুরু করে এবং সাধারণত নভেম্বর পর্যন্ত বিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি রঙিন করে রাখে লাল শাপলা।

স্থানীয়দের কাছে এটি সাতলা বিল নামে পরিচিত হলেও লাল শাপলার আধিক্যের কারণে দেশের মানুষের কাছে ‘সাতলার লাল শাপলার বিল’ নামেই বেশি পরিচিত। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন এই বিলে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নৌকায় বিল ঘুরে দেখার সুযোগ পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমির এই নিম্নাঞ্চল বর্ষার পানিতে ডুবে গেলে শাপলা ফুটতে শুরু করে। বিলের পানির ওপর সারি সারি লাল শাপলা সূর্যের আলোয় যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

স্থানীয়রা জানান, যুগ যুগ ধরে তারা এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখে আসছেন। লাল শাপলার পাশাপাশি সাদা ও বেগুনি শাপলারও দেখা মেলে। তবে লাল শাপলার সংখ্যাই বেশি।

বিলের মাঝখানে থাকা বাড়িঘরের মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌকা। পর্যটকরাও ছোট নৌকায় চড়ে বিলের ভেতর ঘুরে দেখতে পারেন। ফুলের ফাঁকে ফাঁকে নৌকা চলার দৃশ্য পুরো পরিবেশকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়।

বরিশাল শহর থেকে ঘুরতে আসা সাকিল বলেন, সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

পার্শ্ববর্তী উপজেলা বাবুগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা নুর মোহাম্মদ বলেন, আমি প্রতিবছর এই শাপলার বিলে আসি। খুব সকালে এলে শাপলার সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। চারপাশে লাল শাপলা আর নৌকায় ভেসে থাকার অনুভূতি অন্যরকম। এখানে এলে মনে হয় প্রকৃতির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।

শুধু শাপলা নয়, সাতলা বিলের জীববৈচিত্র্যও পর্যটকদের টানে। সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই ও কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন দেশীয় পাখির বিচরণ দেখা যায় বিলে ও এর আশপাশে। ফলে প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমীদের কাছেও জায়গাটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য।

দীর্ঘদিন ধরে সাতলার শাপলা বিল পর্যটকদের আকৃষ্ট করলেও পর্যাপ্ত পর্যটন অবকাঠামো না থাকায় নানা ধরনের অসুবিধায় পড়তে হতো দর্শনার্থীদের। এবার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিলটিকে আরও আধুনিক, আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাপলা বিলের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য আধুনিক ভিউ পয়েন্ট, ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের ফলে পর্যটকরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিলের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানাগেছে।
স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে শাপলা বিলের সৌন্দর্য দেশজুড়ে তুলে ধরার পাশাপাশি পর্যটন বিকাশে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সাতলার শাপলা বিল শুধু উজিরপুরের নয়, বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটন সম্পদ। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটক আসায় স্থানীয়ভাবে নৌকা, পরিবহন, খাবারসহ বিভিন্ন সেবাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বাড়ে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পর্যটন অবকাঠামো আরও উন্নত হলে স্থানীয় তরুণদের জন্য নৌকা পরিচালনা, খাবারের দোকান, পর্যটনসেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সচেতন মহল মনে করছেন, পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়। অতিরিক্ত স্থাপনা কিংবা পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডে যাতে শাপলা ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

যেভাবে যাবেন সাতলার বিলে, সাতলার শাপলা বিলে যেতে ঢাকা থেকে সড়ক বা নৌপথে বরিশাল আসা যায়। সড়কপথে বরিশাল থেকে উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী বাসস্ট্যান্ডে এসে সেখান থেকে ইজিবাইক বা মাহিন্দ্রায় উত্তর সাতলার শাপলা বিলে যাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে নৌপথে বরিশাল এসে সেখান থেকেও সড়কপথে উজিরপুরের সাতলায় যাওয়া সম্ভব। শাপলা গ্রামের আশপাশে স্থানীয় খাবারের হোটেল রয়েছে। তবে রাতযাপনের জন্য পর্যটকদের উজিরপুর সদর কিংবা বরিশাল শহরের আবাসিক হোটেল ব্যবহার করতে হয়।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, সাতলার শাপলা বিল উজিরপুরের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনার জায়গা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবেশদ্বার, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলাসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের মাধ্যমে স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তোলার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে এটি শুধু উজিরপুর নয়, বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ারও সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রকৃতির অপরূপ লাল শাপলা, বিস্তীর্ণ বিল, নৌভ্রমণ, পাখির কলকাকলি আর গ্রামীণ পরিবেশ- সব মিলিয়ে সাতলার শাপলা বিল এখন দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। তাই প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষ চাইলে অন্তত একটি সকাল প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটাতে ঘুরে আসতে পারেন সাতলার লাল শাপলার বিলে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন