পুনরুত্থানে সংবাদ প্রকাশের পর গুচ্ছগ্রামের শিশুকে ভর্তি, তদন্তে কমিটি
‘
বোয়ালমারীতে সরকারি প্রা: বিদ্যা: পুরাতন ভবন টেন্ডার ছাড়াই বিক্রির অভিযোগ
এ শিরোনামে দৈনিক পুনরুত্থানে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে ফরিদপুরের বোয়ালমারীর রাখালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং গুচ্ছগ্রামের এক শিশুকে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
তবে তদন্ত শুরুর আগেই অভিযোগকারীকে বিভিন্নভাবে চাপ ও হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নের রাখালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহানের বিরুদ্ধে গুচ্ছগ্রামের শিশুদের ভর্তি না নেওয়া এবং ভর্তি করলেও সরকারি বই ও স্কুল ফিডিংয়ের খাবার দেওয়া হবে না বলে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ১৯ আগস্ট দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
অভিযোগকারী গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আসমা বেগমের মেয়ে সোহনা (৬)।
আসমা জানান, বছরের শুরুতে মেয়েকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে গেলে প্রধান শিক্ষক ভর্তি নেওয়া যাবে না বলে জানান। ভর্তি করলেও বই ও খাবার পাওয়া যাবে না বলেও জানানো হয়। এতে তাঁর মেয়ে দীর্ঘদিন পড়াশোনার বাইরে ছিল। সংবাদ প্রকাশের পর এখন তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি নেওয়া হয়েছে।
আসমা বেগম বলেন, ‘এতদিন ভর্তি নেয়নি। সাংবাদিকরা সংবাদ করার পর এখন ভর্তি নিয়েছে। আগে ভর্তি নিলে মেয়েটা সারা বছর পড়াশোনা করতে পারত। আমার মেয়েটা খুবই মেধাবী।’
অভিযোগ করার পর তাঁকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য বিভিন্ন লোককে দিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
গুচ্ছগ্রামের আরেক বাসিন্দা রিক্তা বেগমের অভিযোগ, গত বছর তাঁর ছেলে আজিম মোল্যাকে (৮) বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে গেলে গুচ্ছগ্রামের কোনো শিশুকে ভর্তি করা যাবে না বলে জানানো হয়। পরে তিনি ছেলেকে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বারাংকুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। এ বিষয়ে তিনি বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান ২০১৩ সালে যোগ দেওয়ার সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল তিন শতাধিক। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১০০-এর ঘরে নেমেছে। চলতি বছর শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে মাত্র ৬ জন।
স্কুলের আশপাশের অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের আচরণ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অনাগ্রহের কারণে বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী হারিয়েছে।
তবে প্রধান শিক্ষক এ অভিযোগ অস্বীকার করে আশপাশের মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেনকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করেছেন।
বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক আবুল বাশারসহ নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের আরো দুই শিক্ষকও গুচ্ছগ্রামের শিশুদের ভর্তি নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, কোনো শিশু ভর্তি হতে এলে বই ও খাবার না পাওয়ার কথা বলে নিরুৎসাহিত করা হতো।
বিদ্যালয়ের পুরোনো এক কক্ষবিশিষ্ট টিনশেড লাইব্রেরি ভবন নিলাম ছাড়াই বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল রেজল্যুশনের মাধ্যমে ভবনটি ১৯ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ভবন ভাঙার শ্রমিক খরচ দেখানো হয় ১২ হাজার ৭৫০ টাকা।
এলাকাবাসীর দাবি, ভবনটিতে প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার ইট, লোহার অ্যাঙ্গেল ও টিন ছিল। তাঁদের ধারণা, সে সময় ভবনটির বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ টাকা হতে পারে।
প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান বলেন, ভবনটি টেন্ডার দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলায় তাড়াহুড়ো করে রেজল্যুশনের মাধ্যমে ভবনটি ১৯ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের মাইনর মেরামতের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, ভ্যাট বাদ দিয়ে তিনি এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করেন।
নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ মার্চ মেসার্স কুন্ডু স্টোর থেকে রংসহ বিভিন্ন মালামাল কেনা হয় ৫২ হাজার ৭০৫ টাকায়। অথচ বিদ্যালয়ের রেজল্যুশনে একই মালামালের খরচ দেখানো হয়েছে ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ১৯ হাজার ৭৯৫ টাকা।
মেরামতের অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কোনো ভাউচার নেই বলেও স্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক। তিনি আরো দাবি করেন, রেজল্যুশন খাতায় খরচের হিসাব লেখা হয়েছে এবং এর ফটোকপি শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, সোমবার সরেজমিনে তদন্ত করা হবে। প্রধান শিক্ষক ও অভিযোগকারীদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
বোয়ালমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা বিভাগের সভাপতি এস এম রকিবুল হাসান বলেন, নিলাম ছাড়া সরকারি ভবন বিক্রি, শিক্ষার্থী কমে যাওয়া ও অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে।
বোয়ালমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও রেনিনগর আলহাজ্ব মজিবর আমীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের জন্য দুঃখজনক। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের এক ভাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করেন না। তবে এ অভিযোগের তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, ‘গুচ্ছগ্রামের শিশু ভর্তির সুযোগ পাবে না, পেলেও বই-খাবার পাবে না!’ শিরোনামে দৈনিক কালের কণ্ঠের অনলাইন ভার্সনে সংবাদ প্রকাশ হলে নড়েচড়ে বসে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। সংবাদ প্রকাশের দুইদিন পরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: