রাজধানীতে বাড়ছে অজ্ঞাত লাশ
রাজধানীতে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়। অথচ এই শহরেই এমন মানুষ মারা যাচ্ছেন, যাদের মৃত্যুর পরও জানা যাচ্ছে না নাম-পরিচয়। সড়কের পাশে, ফুটপাত, হাসপাতালের গেট, খাল কিংবা নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাত মরদেহ। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠাচ্ছে। ছবি তুলে ও পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালিয়েও স্বজনের সন্ধান না মিললে শেষ পর্যন্ত সেই লাশ হয়ে যাচ্ছে বেওয়ারিশ।
ডিএমপির প্রকাশ্য নথি ও বিভিন্ন থানার তথ্য বলছে, চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর একাধিক এলাকায় এমন মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর পূর্ণাঙ্গ আট মাসের সমন্বিত সংখ্যা প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু মে ও আগস্টেই শাহবাগ থানার অধীনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে দুটি অজ্ঞাত নারী মরদেহের পরিচয় শনাক্তে পুলিশের পক্ষ থেকে জনসাধারণের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মে মাসে উদ্ধার হওয়া নারীর বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। আর ১২ আগস্ট উদ্ধার হওয়া কিশোরীর বয়স আনুমানিক ১৫ বছর।
শাহবাগে পরিচয়হীন মৃত্যুর ছাপ : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা হওয়ায় শাহবাগে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বেশি দৃশ্যমান। হাসপাতালে অসুস্থ বা ভবঘুরে মানুষের মৃত্যু, স্বজনের রেখে যাওয়া মরদেহ কিংবা দুর্ঘটনায় পরিচয়হীন ব্যক্তির লাশ—বিভিন্ন কারণে পুলিশকে এসব মরদেহের পরিচয় শনাক্তে কাজ করতে হয়। ১২ আগস্টের ঘটনাটিই এর একটি নির্মম উদাহরণ। পরিবারের লোকজন ১৫ বছর বয়সি কিশোরীকে মৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে আসে। তাকে চিকিত্সকের কাছে নেওয়ার সময় পরিবারের লোকজন সরে যায়। পরে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ পরিচয় শনাক্তে সহায়তা চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়।
লাশের পরিণতি কী? : অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথমে পুলিশ সুরতহাল করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরিচয় শনাক্তের জন্য ছবি, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজন হলে ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু দিনের পর দিন স্বজনের সন্ধান না মিললে মর্গে মরদেহ পড়ে থাকে। এরপর আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের দায়িত্ব নেয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। সংস্থাটি কাফন, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করে। রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের ক্ষেত্রে জুরাইন কবরস্থান গুরুত্বপূর্ণ শেষ ঠিকানা।
অর্থাত্ একজন অজ্ঞাত মানুষের শেষ যাত্রার শুরু হয় পুলিশের উদ্ধার দিয়ে, শেষ হয় এমন একটি কবরে—যেখানে হয়তো কোনোদিনই তার নাম লেখা হয় না।
দাফনের পরও শেষ হয় না প্রশ্ন : সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দাফনের পর কোনো পরিবার যদি নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পায়, তখন পরিচয় শনাক্ত করা আরো কঠিন হয়ে যায়। অতীতে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের পরিচয় পরে শনাক্ত করার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি রায়েরবাজারে দাফন করা মরদেহের ক্ষেত্রে কবর শনাক্তকরণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য : পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তে থানাগুলো নিয়মিত ছবি ও বর্ণনা প্রকাশ করছে। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার সহায়তা নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি ভবঘুরে, অসুস্থ কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পরিচয় শনাক্তে সময় লাগে। তবে প্রশ্ন হলো—একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার তাকে খুঁজছে কি না, সেই তথ্যের সঙ্গে অজ্ঞাত মরদেহের তথ্য কতটা সমন্বিত হচ্ছে?
নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা, হাসপাতালের মর্গ, থানা ও ডিএনএ তথ্য যদি একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়, তাহলে পরিচয় শনাক্তের গতি বাড়তে পারে। কারণ একটি অজ্ঞাত লাশ কখনোই শুধু একটি লাশ নয়। তার পেছনে থাকতে পারে অপেক্ষায় থাকা বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান কিংবা ভাই-বোন। মর্গ থেকে জুরাইনের কবরে পৌঁছে যাওয়ার পরও হয়তো কোথাও একজন মানুষ অপেক্ষা করেন—‘আমার মানুষটি কি ফিরবে?’
দৈনিক পুনরুত্থান /
- বিষয়:
- রাজধানীতে বাড়ছে অজ্ঞাত লাশ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: