বিরলরোগে আক্রান্ত শিশু রাইয়ান, বাঁচাতে প্রয়োজন ৭ লক্ষাধিক টাকা
এক বছরের ছোট্ট রাইয়ান ইসলাম জন্ম নিয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা নিয়ে। বিরল ওমফালোসিল (Omphalocele) রোগে আক্রান্ত এই শিশুটির জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন জরুরি অস্ত্রোপচার, যার জন্য দরকার প্রায় সাত লাখ টাকা। অথচ দিনমজুর বাবার সীমিত আয়ে সেই চিকিৎসা ব্যয় বহন করা একেবারে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানের কষ্টে অসহায় এই পরিবারটি এখন কেবল সহৃদয় মানুষের সাহায্যের আশায় দিন গুনছে।
আক্রান্ত শিশুটি রাজবাড়ী সদরের কলেরবাজার এলাকার দিন মজুরি মো. রিমন ব্যাপারী-মিথিলা পারভীন দম্পতির ছেলে। বর্তমান পাবনা শহরের শালগাড়িয়ার রেনেসাঁ পাঠাগার এলাকায় শ্বশুরের ভাড়া বাসায় বসবাস করেন এই দম্পতি। শ্বশুর মিলন আলীর গ্রামের বাড়ি মালঞ্চি ইউনিয়নের ফকিরপুরে। তিনিও দিন মজুরির কাজ করে সংসার পরিচালনা করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের এপ্রিল মাসের ২১ তারিখে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে রাইয়ানের জন্ম হয়। শিশুটি এই রোগ নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। এরপর শিশুটিকে চিকিৎসক জরুরিভাবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। রাজশাহী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর থেকে পাবনার একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত চিকিৎসা চলছে শিশুটির। প্রতি মাসে রাইয়ানের চিকিৎসকের পরামর্শ ও চেকআপ করানো হয়। প্রতি সপ্তাহে ওষুধসহ শিশুটির পেছনে অন্তত ৬/৭ হাজার টাকার খরচ হয় পরিবারটির। অনেক সময় টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারেন না তারা। আবার নিয়মিত ডাক্তার দেখাতেও হিমশিম খেতে হয়।
শিশুটির বাবা রিমন ব্যাপারী পাবনা শহরের দিন মজুরির কাজ করে সপ্তাহে ১২/১৪শ টাকা আয় করেন। শিশুটির নানা মিলন আলীও দিন মজুরির কাজ করেন। কয়েক বছর আগে তিনি রংয়ের কাজ করতে গিয়ে বিল্ডিং থেকে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে যাওয়াতে ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। দুইজন মিলে কাজ করেও তাদের সংসার চলাতে কষ্ট হয়। এখন শিশুটির বিরল রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটিকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
পরিবারটি জানায়, আর্থিক সংকটের কারণে এতোবড় একটি রোগ হলেও ঢাকায় ভালো চিকিৎসকের থেকে চিকিৎসা করাতে পারেনি তারা। কিছুদিন রাজবাড়ীতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। এরপর পাবনাতেই স্থায়ীভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বারবার শহরের হালিমা ক্লিনিক থেকে আল্ট্রাস্নোগ্রাম করানো হয়। তবে তারা সঠিক তথ্য পরিবারকে জানায়নি বলে পরিবারটি অভিযোগ করেন।
শিশুটির মা মিথিলা পারভীন বলেন, বাচ্চার জন্য অনেক কষ্ট হয়। রাত-দিন ঘুমাতে পারি না। ঠিকমত খাইতেও পারি না। খুবই টেনশন হয়। আমার স্বামীর আর্থিক সমস্যা আবার বাবারও অর্থ সংকট। সবাই যদি আমার পাশে থাকে তাহলে একটু আয়েশ পাই। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও ছেলেটা ভালো হয়ে যাক।
তিনি আরও বলেন, সঠিক সময়ে অপারেশন না হলে ছেলেটার বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেকে বাঁচাতে সবার সহযোগিতা চাই। আপনারা আমার সন্তানকে বাঁচান। বিত্তবান ও সরকারের কাছে ছেলের জন্য প্রাণ ভিক্ষা চাইছি।
প্রতিবেশী মোছা. দীপ্তি বেগম বলেন, আসলে এই ছেলের জন্য আমাদের খুবই মায়া হয়। সবাই যদি আমরা তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসি তাহলে খুবই ভালো হয়। ৫ থেকে ৭ লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন। অর্থাভাবে শিশু রাইয়ানের চিকিৎসা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দ্রুত সহায়তা না পেলে তার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
শিশুটির নানা মিলন আলী বলেন, আমার যেহেতু আর্থিক সংকট, বাচ্চার বাবারও আর্থিক সংকট, অর্থ না থাকায় আমি মানুষের কাছে হাত পাততেছি। যে যে টাকা দিচ্ছে ওই টাকাই জমা করতেছি চিকিৎসার জন্য। মাসুম বাচ্চাটাকে তো বাঁচাতে হবে। সামনের ২১ তারিখ আসলে রাইয়ানের এক বছর পূর্ণ হবে। দিনমজুরি করে বাচ্চাকে চিকিৎসা করাচ্ছি। গত ঈদেও কাজ করে বাচ্চার চিকিৎসার জন্য টাকা দিয়েছি। জীবন দিয়ে হলেও আমার নাতিকে আমি বাঁচাতে চাই। এজন্য দেশবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন।
শিশু রাইয়ানের চিকিৎসক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম বলেন, শিশুটিকে আমি কয়েকমাস ধরে চিকিৎসা দিচ্ছি। তার বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েছে। যেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে Omphalocele (ওমফালোসিল) বলে। এটি একটি গুরুতর জন্মগত ত্রুটি, যেখানে শিশুর পেটের প্রাচীর ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় অন্ত্র, লিভার বা অন্যান্য অঙ্গ নাভির ছিদ্র দিয়ে পেটের বাইরে চলে আসে। গর্ভাবস্থায় এই সমস্যা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ধরা পড়ে এবং জন্মের পর এর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি ব্যয়বহুল ও ঝুকিপূর্ণভাবে অস্ত্রোপচার করতে হবে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর সুস্থ হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার তামারা তাসবিহা বলেন, আপনার মাধ্যমেই এটি জানতে পারলাম। শিশুটি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: