বাস্তুচ্যুত হতে পারেন ১ কোটি ৩৩ লাখ বাংলাদেশি
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই স্থানান্তরে বাধ্য হতে পারেন। এ সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার এই আশঙ্কার পাশাপাশি উপকূলীয় বন্যা, লবণাক্ততা ও ভূমি অবনমন দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ-অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিস্থিতিতে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যার শিকার হতে পারেন। এ সময় বন্যার কারণে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্য ও বন্যার ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদেরই দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কিংবা ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্য সবচেয়ে কম।
উপকূলীয় ঝুঁকির পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীর অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। নগরীর নির্মিত এলাকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এমন স্থানে অবস্থিত, যেখানে ভয়াবহ উপকূলীয় বন্যা হলে পানি জমে যেতে পারে। অথচ এসব এলাকাতেই বসতি বাড়ছে সবচেয়ে দ্রুত।
এডিবির হিসাবে, চট্টগ্রাম নগরীর নির্মিত এলাকার আয়তন ২০১৬ সালে ছিল ৬৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটারে। এই সময়ে বন্যাপ্রবণ এলাকায় বসতি বেড়েছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। বিপরীতে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বসতি বৃদ্ধির হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। পুরো নগরীতে এ হার ১১ দশমিক ২ শতাংশ। যেসব এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সময় শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত পানি উঠতে পারে, সেখানে বসতি বৃদ্ধির হার ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আর যেখানে পানির গভীরতা ১ দশমিক ৫ মিটারের বেশি হতে পারে, সেখানেও বসতি বেড়েছে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের উপকূলীয় বদ্বীপের বিভিন্ন অংশ ভূমি অবনমনের শিকার হচ্ছে। কোথাও কোথাও বছরে ৪ থেকে ৫৫ মিলিমিটার পর্যন্ত ভূমি দেবে যাচ্ছে। এতে কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা বাড়ছে এবং উপকূলীয় প্লাবনের ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে। লবণাক্ততার অনুপ্রবেশও উপকূলের মানুষের জন্য বড় সংকট। শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা প্রায়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায়। প্রতিবেদনে লবণাক্ত পানির সঙ্গে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এডিবির হিসাবে, জলবায়ু অভিযোজনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানের ছয় গুণের বেশি এবং ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ২০ গুণ হতে পারে। বর্তমানে ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতিতে বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ বিলিয়ন বা দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এই ক্ষতি ২০৫০ সাল নাগাদ ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২১০০ সাল নাগাদ ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ক্ষয়ক্ষতি বর্তমান মাত্রার কাছাকাছি রাখতে উপকূলীয় সুরক্ষায় বছরে ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এতে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বন্যাজনিত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি ডলার এবং ২১০০ সাল নাগাদ ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা এক হাজার ৩৬০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ হিসাব ২০২০ সালের মূল্যমান অনুযায়ী। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলো প্রতিবছর প্রায় সাত ট্রিলিয়ন বা সাত লাখ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদনে অবদান রাখে। এসব এলাকার বন্দর, বাণিজ্য ও পর্যটন অবকাঠামো জলবায়ু ঝুঁকির মুখে পড়ায় আঞ্চলিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এডিবির জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভ বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়াজনিত বিপদের কারণে এসব অঞ্চল ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে পড়ছে। তিনি বলেন, নিরাপদ জনজীবন ও সচল অর্থনীতি বজায় রাখতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য এবং ঝুঁকি-সচেতন সমাধান নিয়ে কাজ করতে হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: