সাগরে বিলীন কুয়াকাটার ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স, হুমকিতে মেরিন ড্রাইভ ও বেড়িবাঁধ
লিটু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্সটি সাগরের করাল গ্রাসে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভের সানসেট পয়েন্টসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। এতে সাগররক্ষা বাঁধ ও নবনির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্সটি সম্পূর্ণ ভেঙে সাগরে তলিয়ে যায়। এ ছাড়া মেরিন ড্রাইভের সানসেট পয়েন্টেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিমে লেম্বুর বন পর্যন্ত সাগররক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক দেবে গেছে ও স্থানচ্যুত হয়েছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে কিছু এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে যে কোনো সময় সাগররক্ষা বাঁধ ভেঙে কুয়াকাটার লোকালয়ে লোনা পানি ঢুকে পড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই কুয়াকাটা সৈকতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সৈকত ক্রমেই লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্দোলন ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে এর প্রতিকার চেয়ে আসছেন। ভাঙন রোধে পাউবোর পক্ষ থেকে এর আগে তিনটি প্রকল্প
পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হলেও তা অনুমোদন পায়নি। সর্বশেষ গত বছর ৭৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়, যা এখনো পাস না হওয়ায় স্থায়ী সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
বর্তমানে জিরো পয়েন্টের পশ্চিম প্রান্তে সাগরের বড় বড় ঢেউ সরাসরি বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়ছে। এতে বাঁধের সামনের সিসি ব্লকগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়ছে, যা অব্যাহত থাকলে বাঁধের স্থায়িত্ব বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
টোয়াক সভাপতি: ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, “জিরো পয়েন্টে বর্তমানে যেখানে বেড়িবাঁধ, সেখানে একসময় সমুদ্র ছিল অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে। গত ৩০ থেকে সেই দেড় কিলোমিটার সৈকত সাগরে বিলীন হয়ে এখন সমুদ্র বেড়িবাঁদের একদম কাছে এসে ঠেকেছে।”
উন্নয়ন কমিটির সদস্য: কুয়াকাটা উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সদস্য ফারুক মীর জানান, ওই বিস্তৃত সৈকত ছাড়াও ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, এলজিইডির বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট কাম রেস্ট হাউজ, ইকোপার্ক, ঝাউবন, সাগরঘেঁষা সড়ক ও বহু হোটেল-মোটেল ইতিমধ্যে বিলীন বা হুমকির মুখে পড়েছে।
পরিবেশকর্মী: স্থানীয় পরিবেশকর্মী আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, বর্ষা মৌসুমে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও এতে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না, বরং সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি: কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, চার শতাধিক হোটেল-রিসোর্টে ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু ভাঙনের কারণে আজ পুরো পর্যটনশিল্পই ধ্বংসের মুখে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে এই খাত।
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, “কুয়াকাটায় ভাঙন প্রতিরোধের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় বেশি হওয়ায় অনুমোদন পেতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তাই কম ব্যয়সাপেক্ষ একটি বিকল্প প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা খুব দ্রুত সরকারের কাছে দাখিল করা হবে। এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, “প্রাথমিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প অনুমোদনের কাজও এগিয়ে চলছে। আশা করছি, খুব শীঘ্রই কুয়াকাটায় সাগরভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।”
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: