পাঁচটি খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে যাতায়াত: গলাচিপার চরকারফারমার শিশুদের প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ
লিটু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ সাঁকো থেকে স্রোতের পানিতে পড়ে যায় দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশু। চোখে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় সে পানি থেকে উঠতে পারছিল না। পরে কোনোমতে খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে নিজের সন্তানকে উদ্ধার করেন তার বাবা। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, পটুয়াখালীর গলাচিপার বিচ্ছিন্ন চরকারফারমা এলাকার শিশুদের জন্য এমন ঝুঁকি যেন প্রতিদিনের রুটিন ও এক অবধারিত জীবনযুদ্ধ। শিক্ষা অর্জনের তাগিদে প্রতিদিন তাদের পেরোতে হয় অন্তত পাঁচ থেকে সাতটি খাল। কোথাও সাঁতরে, আবার কোথাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নড়বড়ে সাঁকো ধরে পাড়ি দিতে হয় এসব পথ।
বর্ষাকাল কিংবা জোয়ারের সময় পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গেলে এই পথ পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। সামান্য একটু অসাবধানতা বা পা ফসকালেই ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। অনেক সময় তীব্র স্রোতের কারণে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। তবুও অদম্য কৌতূহল ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জেদ নিয়ে এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথ মাড়িয়েই বিদ্যালয়ে ছুটে চলে কোমলমতি শিশুরা।
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা সদর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন এলাকা চরকারফারমা। এখানে প্রায় চারশ পরিবারের প্রায় দেড় হাজার মানুষের বসবাস। ২০১৮ সালে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আলো ছড়াতে এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। দ্বীপসদৃশ এই চরের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একমাত্র পাকা ভবন এটি। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নেই কোনো পাকা সড়ক কিংবা নিরাপদ কোনো সাঁকো।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে পৌঁছাতে আশপাশের অন্তত পাঁচ থেকে সাতটি খাল পার হতে হয়। প্রতিদিন নিয়মিত ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। বর্ষা মৌসুমে বা জোয়ারের সময় খালগুলো যখন পানিতে থৈ থৈ করে, তখন এগুলো পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, যার ফলে তাদের নিয়মিত পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
চতুর্থ শ্রেণির এক ক্ষুদে শিক্ষার্থী তার দুর্ভেগের কথা বলতে গিয়ে জানায়, “আমরা অনেক খাল সাঁতরাইয়া স্কুলে আসি। আমাদের খুব কষ্ট হয়। বাড়ি থেকে আসার সময় আমাকে দুইটা জামা লইয়া আসতে হয়। একটা পরনের জামা ভিজে গেলে, ব্যাগে থাকা শুকনা জামাটা স্কুলে আইয়া বদলাই।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নিসার উদ্দিন বলেন, শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও এই ভয়ংকর খালগুলো পেরিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে হয়। এতে প্রতিদিন তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় দ্রুত রাস্তা এবং খালের ওপর নিরাপদ সাঁকো নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগির বলেন, এলাকাটি অত্যন্ত নিচু হওয়ায় জোয়ারের পানি এলেই পুরো এলাকা প্লাবিত হয়। বিষয়টি ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকৌশল বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দুর্ভোগ লাঘবে কয়েকটি খালের ওপর সাঁকো নির্মাণ এবং বাকি পথ রাস্তার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
অভিভাবক ও চরবাসীর একটাই দাবি—তারা আর নিজ সন্তানদের পানিতে ডুবে যাওয়া বা স্রোতে ভেসে যাওয়ার বুকভাঙ্গা আতঙ্ক নিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না। নিরাপদ রাস্তা ও সাঁকো নির্মাণের পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের সময় যোগাযোগ সচল রাখতে প্রয়োজনীয় টেকসই বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। চরবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা, দ্রুত নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে চরকারফারমার শিশুদের শিক্ষার পথ আর কণ্টকাকীর্ণ না থাকে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: