• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, নতুন অধ্যায়ের পথে বিএনপি


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০:২৭ পিএম;
খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, নতুন অধ্যায়ের পথে বিএনপি

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। তবে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন ও আবেগঘন। কারণ, দলটির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়াই এবার প্রথমবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এবার দলটির সামনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ পথচলার প্রশ্ন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর ৪৮ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে দলটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজপথে সক্রিয় ছিল দলটি।

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি গড়ে ওঠে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকে তিনি সক্রিয়ভাবে দলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। এরপর প্রায় চার দশক তিনি দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন।

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন খালেদা জিয়া। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি দেয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপির নেতৃত্ব তার হাতেই ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু ক্ষমতা ও নির্বাচনি সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তাকে যেতে হয়েছে। ২০০৭ সালের পর রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তিনি মামলা ও কারাবাসের মুখোমুখি হন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সীমিত হয়ে পড়ে। বিএনপি ও তার সমর্থকদের দাবি ছিল, এসব মামলা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে খালেদা জিয়া মুক্তি পান। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এবার তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হওয়ায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে আবেগ ও শোকের আবহ।

বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে খালেদা জিয়া শুধু দলীয় চেয়ারপারসন ছিলেন না; দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক ছিলেন তিনি। ফলে তার অনুপস্থিতিতে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

এ অবস্থায় বিএনপির রাজনীতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর দেশে ফেরাকে ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে বিএনপিকে এগিয়ে নেওয়া, সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মরণ ও পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে ভিত্তি করে নতুন নেতৃত্বে দলটি কীভাবে এগিয়ে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশেষ করে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, দলীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে এবং বিরোধী দলে থেকেও বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দেশের রাজনীতিতে দলটি একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছে।

এবার সেই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম প্রধান নেত্রী খালেদা জিয়া নেই। রয়েছে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকার সামনে রেখে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি প্রবেশ করছে নতুন এক অধ্যায়ে। তাই এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু অতীতের গৌরব ও সংগ্রাম স্মরণের দিন নয়; বরং খালেদা জিয়ার পরবর্তী বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও পথচলার দিকনির্দেশনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন