• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

তালতলী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র: ধোঁয়া ও বর্জ্যে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৯:৩৯ পিএম;
তালতলী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র: ধোঁয়া ও বর্জ্যে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য

লিটু, স্টাফ রিপোর্টার:

 

বরগুনার তালতলী উপজেলার বড় অঙ্কুজানপাড়া গ্রামে পায়রা নদীর মোহনায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও এর সুফল ছাপিয়ে এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র পরিবেশগত সংকট। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় এই প্রকল্প চালু হলেও বিষাক্ত ধোঁয়া, বর্জ্য ও জ্বালানি কয়লার নেতিবাচক প্রভাবে এ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য, মৎস্য সম্পদ এবং অনন্য জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

পায়রা ও বিষখালী নদীর মোহনা এবং সাগরের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাত্র দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন টেংরাগিরি বনাঞ্চল (ফাতরার বন), জনপ্রিয় ‘শুভসন্ধ্যা’ সমুদ্রসৈকত, টেংরাগিরী ইকোপার্ক এবং নদীর অপর প্রান্তে হরিণঘাটা বন। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনের এত কাছে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গাছপালা ও বন্য প্রাণীর ওপর।

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয় মানুষ
বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর থেকেই এলাকার নির্মল বায়ু ও পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং ক্ষতিকর উপাদান বায়ুমণ্ডলে মিশে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা মারাত্মক শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে এলাকায় চর্মরোগী ও হাঁপানি রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। বায়ুদূষণ ও বিষাক্ত কয়লার ধোঁয়ার কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

নদী ও মৎস্য সম্পদে বিপর্যয়
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান কাঁচামাল খনিজ কয়লা জাহাজে করে এনে নামানোর সময় গুঁড়া পানিতে মিশে যাচ্ছে। এছাড়া গরম পানি ও বিভিন্ন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পায়রা ও বিষখালীর পানির গুণমান নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পানিতে অ্যালুমিনিয়াম, সালফার ডাই-অক্সাইড, পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর পদার্থ মিশ্রিত হওয়ায় ইলিশসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজনন ও জীবনচক্র মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মোহনা এলাকায় নদীর মাছের অভয়ারণ্য নষ্ট হওয়ায় জেলেরাও আজ মাছশূন্য হয়ে পড়েছেন।

কৃষি, বন ও পর্যটনে ধাক্কা
কয়লা পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন কার্বন, সালফার ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস বায়ু ও মাটিতে মিশে টেংরাগিরি ও হরিণঘাটা বনের গাছপালা ও প্রাণীকূলকে হুমকিতে ফেলেছে। এর পাশাপাশি, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতের সামনে থেকে ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রটি আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা না হলে এই উপকূলীয় জনপদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন