জন্মের ২২দিনে চলে যায় মা, গণটিুনীতে নিহত হলো বাবা
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :
পৃথিবীটা এক অদ্ভূত আচরণে চলে। যা সাধারণের বোধগম্য হওয়া খুবই কঠিন। সম্প্রতি ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামে ঘটেছে এক হৃদয় বিদারক মর্মস্পর্ষি ঘটনা। মাত্র দুই বছর ৪ম্স বয়সের ছোট্ট নি:ষ্পাপ শিশুটির মা তাকে রেখে অনত্র চলে যায় তখন তার বয়স মাত্র ২২দিন। সেই থেকে বাবা হান্নান তাকে মাতৃ স্নেহে লালন করেছিলেন। সেই বাবাকে প্রাণ দিতে হলো একদল মানুষের উস্কে দেওয়া মবের হাতে।
এক হাতে দুধের ফিডার, অন্য হাতে দাদির শাড়ির আঁচল। ফিডারের মুখে ঠোঁট, কিন্তু চোখ বেয়ে টপটপ করে ঝরছে জল। দুধ আর কান্না যেন মিশে একাকার। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য এখন ফরিদপুরের বোয়ালমারীর সাতৈর গ্রামের ছোট্ট মুসলিমা ইসলামের নিত্যদিনের গঙ্গি হয়ে গেল।
মাত্র ২৫ মাস বয়সে এতিম হয়েছে সে। জন্মের ২২ দিন পর মা আরিফা বেগম তাকে রেখে অন্যত্র চলে যান। আর গত শুক্রবার (০১মে ২০২৬) রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দায় জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারান তার বাবা, ট্রাকচালক হান্নান শেখ (২৯)।
শনিবার বিকেলে হান্নান শেখের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে বাড়ির আশপাশের আকাশ-বাতাস।
উঠানে চলে স্বজনদের আহাজারি, নারীদের বুকফাটা কান্না আর মানুষের ভিড়ের মাঝখানে কিছুই না বুঝে কখনো দাদির কোলে, আবার কখনো স্বজনদের কোলে ঘুরছে মুসলিমা। কখনো ফিডারের দুধ মুখে দিয়ে চুপচাপ, আবার হঠাৎ ফিডার সরিয়ে হাউমাউ করে কান্না। চারপাশের শোক যেন তার ছোট্ট বুকেও ঢেউ তুলছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা তার জন্মের ২২ দিন পর স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যান।
এরপর থেকে দাদা সাহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমই তাকে লালন-পালন করছেন। বাবার পরশে পেয়েছে মাতৃত্বের ছোয়া ।
দাদি নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা ২২ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি না থাকলে ও কোথায় যাবে? তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলের মাথা ৪-৫ ভাগ করেছে, হাত-পা ভেঙে ফেলা হয়েছে, শরীরের কোথাও দাগ ছাড়া নাই। আমার ছেলেকে গুজব ছড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
নিহতের বাবা সাহিদ শেখ বলেন, আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে অপরাধ করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী হবে? তিনি প্রশাসনে নিকট দাবী জানান, তার ছেলের হত্যা যেন বিচার পান ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে জেলার নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়, এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ‘ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে’ এমন গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
একপর্যায়ে স্থানীয়রা ইট-ব্লক ফেলে রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। পরে চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত হান্নান শেখের মরদেহ শনিবার দুপুর ৩টার দিকে গ্রামের বাড়িতে আনা হয় এবং বাদ আসর সাতৈর শাহী জামে মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে সাতৈর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহত পরিবারের দাবি, গুজব ছড়িয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হান্নানকে হত্যা করা হয়েছে। তারা সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবী করেছেন।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- জন্মের* ২২দিনে,চলে
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: