• ঢাকা
  • বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. আর্ন্তজাতিক

বেইজিংয়ে কূটনৈতিক বার্তা:রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে চীনের সহযোগিতা চা


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:৪৬ এএম;
বেইজিংয়ে কূটনৈতিক বার্তা:রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে চীনের সহযোগিতা চা

নজরুল ইসলাম আলীম:

 

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এবার কূটনৈতিক পরিসরে নতুন বার্তা দিল বেইজিং সফরের মাধ্যমে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের প্রতিনিধি দলের চীন সফর শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি ছিল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।চীনের উপরাষ্ট্রপতি হান জেং এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের বহুমাত্রিক দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, তিস্তা প্রকল্প, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে আসে।বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই বৈদেশিক নীতি পরিচালিত হওয়া উচিত। তিনি “সবার আগে বাংলাদেশ” নীতির কথা উল্লেখ করে জানান, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জও বটে। এই প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল চীনের গঠনমূলক ভূমিকা কামনা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, টেকসই ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে চীনের অব্যাহত সমর্থন অত্যন্ত জরুরি।বিশ্লেষকদের মতে, চীন যেহেতু মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার, তাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের সক্রিয় ভূমিকা বাস্তব ফল বয়ে আনতে পারে। বিএনপির এই কূটনৈতিক অবস্থান ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।বৈঠকে ‘এক-চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়, যা চীনের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। একইসঙ্গে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে “কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ”-এর আওতায় আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে উভয় পক্ষ।তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়েও বিএনপি প্রতিনিধি দল গুরুত্বারোপ করে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি এবং জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই প্রকল্পে চীনের সদিচ্ছা ও অংশীদারিত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়।স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল, রোবোটিক সার্জারি, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, টিকাদান কর্মসূচি এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সহযোগিতা চাওয়া হয়। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ব্যাটারি শিল্প, হালকা ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।চীনা ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি পরিশোধন প্রযুক্তি এবং গ্রামীণ উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে আগ্রহী বলেও জানানো হয়।এ সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—সিপিসি ও বিএনপির মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক মতবিনিময়ের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের বিষয়ে কাজ করতে সম্মত হওয়া। এটি ভবিষ্যতে দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।


চীনের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আশ্বাস দেন চীনের নেতারা।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর বিএনপির আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। বিশেষ করে একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশে এটি ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।বেইজিংয়ের গ্রেট হল থেকে যে বার্তা উঠে এসেছে, তা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নয়—বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দিকনির্দেশনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পর্যন্ত—সবক্ষেত্রেই চীনের সহযোগিতা এখন বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আর বিএনপির এই সফর সেই বাস্তবতার কূটনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন