দেড় মাসের শিশুকে বুকে নিয়েই কারাগার, রাতেই জামিন
নজরুল ইসলাম আলীম:
দেড় মাসের শিশুকে বুকে নিয়েই কারাগার, রাতেই জামিন— যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পীর ঘটনায় তীব্র আলোড়ন
রাজনৈতিক মামলা, আদালতের আদেশ, এক মায়ের অশ্রু আর দেড় মাস বয়সী শিশুর কান্না— সব মিলিয়ে রাজধানীর আদালতপাড়া মঙ্গলবার যেন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হলো। যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে বিস্ফোরক আইনের মামলায় প্রথমে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হলেও রাতেই তিনি জামিন লাভ করেন। তবে এরই মধ্যে শিশুসন্তানকে বুকে নিয়ে তার কারাগারে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে শুনানি শেষে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোস্তাফিজুর রহমান ৫ হাজার টাকা মুচলেকায় পুলিশ রিপোর্ট দাখিল পর্যন্ত তার জামিন মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর তেজগাঁও থানার বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরপর মাত্র দেড় মাস বয়সী কন্যাসন্তান কাইফা ইসলাম সিমরানকে কোলে নিয়ে, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের শারীরিক কষ্ট নিয়েই কাঁদতে কাঁদতে আদালত হাজতখানা হয়ে কারাগারের পথে যেতে দেখা যায় তাকে।আদালতের চতুর্থ তলায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিল্পী বলেন, “রাজনৈতিক কারণে বাচ্চাসহ কারাগারে যেতে হচ্ছে।” তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। আদালতের বারান্দায় বেঞ্চে বসে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর দৃশ্য অনেকের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়।আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি শুনানিতে আদালতকে জানান, শিল্পীর কন্যাসন্তানের বয়স মাত্র ১ মাস ১৬ দিন। সম্প্রতি তার সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে। এই শারীরিক অবস্থায় যেকোনো শর্তে তার জামিন প্রার্থনা করা হয়। কিন্তু প্রথম দফায় আদালত তা নামঞ্জুর করেন।অন্যদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শেখ নজরুল ইসলাম আদালতে বলেন, আসামির বিরুদ্ধে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেলহাজতে রাখা প্রয়োজন বলেও আবেদন করা হয়।মামলার সূত্রে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. তাহমিদ মুবিন রাতুল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীতে ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় অভিযোগ ওঠে, শিল্পীর নির্দেশে একদল হামলাকারী দেশীয় অস্ত্র, পিস্তল ও বোমা নিয়ে তার বাসায় হামলা চালায়। এতে ভাঙচুর, লুটপাট, বিস্ফোরণ এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় গত বছরের ২৫ জানুয়ারি তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি, মানবিকতা এবং বিচারিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন মা, যিনি সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাকে শিশুসহ কারাগারে পাঠানোর দৃশ্য যেমন মানবিক বিবেচনায় প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি মামলার গুরুতর অভিযোগও আইনগত গুরুত্ব বহন করে।সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— বিচার প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? আবার অনেকে মনে করছেন, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত এবং অভিযোগের গুরুত্ব বিচারেই মূল বিবেচ্য হওয়া প্রয়োজন।রাতের জামিনে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও, শিল্পী বেগমের এই ঘটনাটি ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। আদালতের বারান্দায় এক মায়ের কান্না যেন শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নয়— বরং সময়ের এক কঠিন প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- দেড়*মাসের,শিশুকে
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: