• ঢাকা
  • বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পেছনে ‘বড় ভাই’


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:০৪ পিএম;
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পেছনে ‘বড় ভাই’

 নগরে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা থামছে না। খুন, সংঘর্ষ, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরেরা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নগরের অন্তত ১৬টি কিশোর গ্যাংয়ের নাম সামনে এসেছে। 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপে ৩০ থেকে ১০০ জন সদস্য রয়েছে।

কিশোরদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও তাদের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’দের অনেকে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গত ১ অক্টোবর রাতে নগরের খুলশী ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে বিরোধের জেরে মো. হৃদয় (১৬) নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

পুলিশ জানায়, হৃদয় ফাইভ স্টার নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিল। এর আগে সেভেন স্টার গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়েছিল।

পরে তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ফাইভ স্টার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে- বিজয়, কামরান ও শান্ত। সেভেন স্টারের নেতৃত্বে ওয়াকিল হোসেন বগা। এ ঘটনায় দুই পক্ষের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে।

নগরের অন্য এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নগরের জামালখান ও গনি বেকারি এলাকায় ডেঞ্জার গ্রুপ, মুরাদপুরে এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট), পাঁচলাইশে কেবি, এনএস, এক্সমার্ক, ট্রিপল নাইন ও ডট গ্যাং, হালিশহরে বিচ্ছু ও পাইথন এবং চকবাজারে ফোর জিরো সেভেন নামে কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। আমবাগান, ডেবারপাড়, বাকলিয়া ও বায়েজিদ এলাকাতেও কিশোর গ্যাং রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর নগরের বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ রোডে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুরাদ ও জসিম বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ মুরাদ, জসিমসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, সংঘর্ষে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও অংশ নেয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে  নগরে প্রায় ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল। প্রতিটি গ্রুপে ১৫ থেকে ১০০ জন সদস্য ছিল। এসব গ্যাংকে প্রায় ৭০ জন বড় ভাই পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সরকারের পতনের পর তাদের অনেকে আত্মগোপনে গেলেও সেই শূন্যস্থান নতুন পৃষ্ঠপোষকেরা পূরণ করছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে ২০২৪ সালের পর নগরের কিশোর গ্যাংয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর হালনাগাদ করা হয়নি।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর খুলশীতে কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। গত ২৫ জুলাই আমবাগান এলাকায় মাদক কারবারি আলমগীরকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে দুই এসআইসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।

এ ছাড়া গত ১২ এপ্রিল বাকলিয়ায় কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে মারধরের পর আটতলা ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ ওঠে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৭ জুলাই আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড়ে অটোরিকশা জব্দ করাকে কেন্দ্র করে একদল কিশোর ট্রাফিক সার্জেন্টের ওপর হামলা চালায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। যারা কিশোরদের ব্যবহার করছেন, সেই পৃষ্ঠপোষকদের আগে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে,কিশোর গ্যাং দমনে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যারা কিশোরদের ব্যবহার করছে, অর্থাৎ স্থানীয় পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, কাউন্সেলিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান সবসময় চলমান। তাদের পেছনে যেসব বড় ভাই রয়েছে, তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।

সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, মাদক, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের পর শুধু মামলা দায়ের করাই নয়, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মাদক, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে সক্রিয় রয়েছে পুলিশ। 

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন