• ঢাকা
  • সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

প্রতারণা করে যেভাবে পৌনে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ফুডপান্ডা


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০১:৫৯ পিএম;
প্রতারণা করে যেভাবে পৌনে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ফুডপান্ডা

প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি করে ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ফুডপান্ডা লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পান্ডামার্টের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে চারটি মামলা করেছিলেন আইপিএলই ডিসট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী শিহাব মাহমুদ বশির। তার মধ্যে দুই মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে তিন কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ২৫০ টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।

দুই মামলার মধ্যে সোয়া কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ফুডপান্ডা বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ও পান্ডামার্টের ডিরেক্টর সৈয়দা আমবারীন রেজাসহ পাঁচ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। এছাড়া আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। 

অপর অভিযুক্তরা হলেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর জুবায়ের বি এ সিদ্দিকী, ডিরেক্টর তাবরেজ খান (ভারতীয় নাগরিক), হেড অব ক্যাটাগরি ডিরেক্টর দিলারা ফারুক এবং সিনিয়র ম্যানেজার সাজেদুল হক।

দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় গেল ২৬ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাখাওয়াত হোসেন। আর আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় গত ২২ জুন প্রতিবেদন দেন একই থানার আরেক উপ-পরিদর্শক মশিউর রহমান। দুই মামলায় যে পরিমাণ টাকা প্রতারণা করে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল, তদন্তে তার চেয়ে আরও বেশি টাকা আত্মসাতের কথা উঠে এসেছে।

যোগাযোগ করা হলে এসআই সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ব্যবসায়িক লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে ফুডপান্ডার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পান্ডামার্টের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে। তবে ফুডপান্ডা প্রতারক চক্র না। তারা এখনো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যতটুকু অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত শেষে পাঁচ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

আরেক এসআই মশিউর রহমান বলেন, মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ডকুমেন্টের ওপর। এটা লেনদেনকেন্দ্রিক ডকুমেন্টোরি বিষয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পাঁচ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

মামলা সূত্রে জানা যায়, আইপিএলই ডিসট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী শিহাব মাহমুদ বশির গেল বছরের ৩ জুলাই ঢাকার তৎকালীন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছানাউল্যাহর আদালতে এই দুই মামলাসহ মোট চারটি মামলা দায়ের করেছিলেন। আদালত অভিযোগের বিষয়ে গুলশান থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

আড়াই কোটি টাকা প্রতারণা করে আত্মসাতের মামলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিহাব মাহমুদ বিভিন্ন দেশ থেকে এলসির মাধ্যমে বৈধ পথে বিভিন্ন মালামাল আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। ব্যবসা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি ২০২২ সালের ২৩ জুন ফুডপান্ডা লিমিটেডের পান্ডামার্ট নামক প্রতিষ্ঠানের (সুপার সপ) সঙ্গে আমদানি করা পণ্য বিক্রয়ের জন্য চুক্তি করেন। আসামিদের কোম্পানি প্রথম দিকে চুক্তি মোতাবেক পাওনাদি পরিশোধ করতো। পরবর্তী সময়ে বৈধ কারণ ব্যতীত চুক্তি মোতাবেক পাওনাদি পরিশোধে গড়িমসি করে। শিহাব মাহমুদ টাকার জন্য চাপ দিলে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ভয়-ভীতি, হুমকি দিত। ২০২২ সালের জুন মাস থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত শিহাব মাহমুদ চার কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করেন। আসামিরা আড়াই কোটি টাকা পরিশোধ করে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। 

আরও বলা হয়, শিহাব মাহমুদের সঙ্গে চুক্তিতে পণ্য নষ্ট ও রিটার্ন নেওয়ার কোনো শর্ত ছিল না। তবে আসামিরা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে পণ্য নষ্ট মর্মে ভুয়া চালান তৈরি করে অজ্ঞাত ব্যক্তি বা নিজেদের লোক দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট দেখিয়ে ডকুমেন্ট তৈরি করে এবং যথাযথ মূল্য পরিশোধ করে না। গত বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আসামিদের দুই দফা আইনি নোটিশ পাঠান শিহাব মাহমুদ। গত বছরের ২৬ জুন আসামিদের অফিসে গিয়ে পাওনা টাকা দাবি করলে তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দেন।

শিহাব মাহমুদের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করতে চাইলে শর্ত অনুযায়ী তিন মাস আগে জানাতে হবে মর্মে চুক্তিতে বলা হয়। আসামিরা বাদীকে অবগত না করেই ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। যার ফলে তার ২০ জন জনবল, গোডাউন ভাড়া, ফ্রিজ আপ গাড়ির ভাড়া, সরবরাহ করা পণ্য পচনশীল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় ৭০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়া নিয়মিত ট্যাক্স ভ্যাট দেওয়া সত্ত্বেও আসামিদের কোম্পানি বাদীর প্রাপ্ত টাকা থেকে ট্যাক্স, ভ্যাট, ব্যাংক মার্জিন, বিজ্ঞাপন বাবদ ১০ লাখ টাকা কেটে নেয়। ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রতারণা করে আত্মসাৎ করায় বাদী আদালতে চার জনের নামে মামলা দায়ের করেন। তদন্তে বাদীর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উঠে আসে ২ কোটি ৫৩ লাখ ১৮ হাজার ৭৮২ টাকা।

সোয়া কোটি টাকা প্রতারণা করে আত্মসাতের মামলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিহাব মাহমুদ ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করেন। আসামিরা তাকে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। ৫০ জন জনবল, গোডাউন ভাড়া, ফ্রিজ আপ গাড়ির ভাড়া, সরবরাহ করা পণ্য পচনশীল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় তার ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। এছাড়া নিয়মিত ট্যাক্স ভ্যাট দেওয়া সত্ত্বেও আসামিদের কোম্পানি বাদীর প্রাপ্ত টাকা থেকে ট্যাক্স, ভ্যাট, ব্যাংক মার্জিন, বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০ লাখ টাকা কেটে নেয়। সর্বমোট এক কোটি ৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে শিহাব মাহমুদ পাঁচ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। তদন্তে বাদীর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উঠে আসে এক কোটি ২৪ লাখ ২৭ হাজার ৪৬ টাকা।

যোগাযোগ করা হলে মামলার বাদী শিহাব মাহমুদ বলেন, ফুডপান্ডার পান্ডামার্টের বিরুদ্ধে আমি চারটা মামলা দায়ের করেছি। প্রতিবেদনের অপেক্ষায় ছিলাম। দুই মামলায় প্রতিবেদন চলে আসছে। আর দুটি তদন্তাধীন। আশা করছি, ওই দুই মামলায়ও প্রতিবেদন চলে আসবে।

তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তারা মানুষকে ঠকায়। তাদের অপকর্মের শেষ নেই। যে প্রোডাক্ট চকবাজার থেকে ১২ টাকায় কেনা যায়, তারা সেই প্রোডাক্ট বিক্রি করে ১২০ টাকায়। তারা প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে। আমি একা নই, এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন আরও বহু ভুক্তভোগী।

‘তাদের ঢাকায় ১২টা, চট্টগ্রামে একটা গোপন আস্তানা রয়েছে, যেখানে নিষিদ্ধ ও নেশাজাতীয় পণ্য তৈরি করে’— এমনটা দাবি করে শিহাব মাহমুদ বলেন, তদন্তে তাদের অপকর্ম উঠে এসেছে। তারা অপরাধী, এগুলোর এখন ডকুমেন্টসহ প্রমাণ আছে। তাদের বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অপরাধী যেই হোক, ছাড় পাবে না।

এদিকে প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা এই দুই মামলায় ফুডপান্ডা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দা আমবারীন রেজাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ঢাকার একটি আদালত। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ আদেশ দেন।

বাদী পক্ষের আইনজীবী কাজী মফিজুল ইসলাম জানান, আদালতে করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গুলশান থানা পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। আদালত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

এ বিষয়ে ফুডপান্ডা বাংলাদেশ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দা আমবারীন রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘এটা একটা ফরেন কোম্পানি। মামলার বিষয় সম্পর্কে আমি অবগত না। আমাদের লিগ্যাল ফার্ম, ল’ ফার্ম বিষয়গুলো দেখেন।’

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন