নদীর বুকে একখণ্ড প্রাকৃতির ক্যানভাস: পর্যটনের অপার সম্ভাবনায় আমতলীর 'মাঝের চর'
মো: আ: কাইয়ুম, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
চারদিকে প্রমত্তা পায়রা নদীর রুপালি জলরাশি। তার মাঝে শান্ত-স্নিগ্ধ একখণ্ড সবুজ ভূখণ্ড-কোথাও সারি সারি গাছপালা, কোথাওবা দিগন্তজোড়া খোলা প্রান্তর। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, জলতরঙ্গের বুকে রূপসী বাংলা যেন মেলে ধরেছে এক মায়াবী ক্যানভাস।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরম নীরবতা আর নদীর মেলবন্ধনে ঘেরা এই রূপসী ভূখণ্ডটির নাম ‘মাঝের চর’। বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এই চরটি এখন উপকূলীয় পর্যটন সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
অপ্রকাশিত রূপ ও অনুদ্ঘাটিত সম্ভাবনা
পায়রা নদীবেষ্টিত মাঝের চরটি আজও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। নেই সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, আধুনিক নৌঘাট কিংবা দর্শনার্থীদের একটু বসার উপযুক্ত পরিবেশ। তা সত্ত্বেও, কোনো প্রকার কৃত্রিম ছোঁয়া ছাড়াই প্রকৃতি এখানে সাজিয়ে রেখেছে তার আপন রূপের পসরা।
নদীর হাওয়ায় নৌভ্রমণ, বিস্তীর্ণ সবুজ আর নিভৃত গ্রামীণ আবহের এই ত্রিমুখী মেলবন্ধন মাঝের চরকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল ‘ইকো-ট্যুরিজম’ গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ খুলে দিয়েছে।
নদী, সবুজ আর নিস্তব্ধতার ব্যাকুলতা
নগরজীবনের যান্ত্রিকতা আর ইট-কাঠের কোলাহল থেকে দূরে মাঝের চরের পরিবেশ এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি জোগায়। ভোরবেলা নদীতে সূর্যের সোনাঝরা দ্যুতি, বিকেলে পশ্চিম আকাশে আবিরের রঙখেলা আর সন্ধ্যায় থমকে যাওয়া নদীর নীরবতা-প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের মন কাড়তে এসবই যথেষ্ট।
শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, উপকূলীয় মানুষের নদীনির্ভর জীবন সংগ্রাম, ঐতিহ্যবাহী কৃষিকাজ ও সহজ-সরল জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ মিলবে এই দ্বীপে।
আধুনিক নয়, প্রয়োজন ‘পরিবেশবান্ধব’ উন্নয়ন
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বজায় রেখে উন্নয়ন ঘটাতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনার বিকল্প নেই। চরের ভূমির ধরন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে একটি সুষ্ঠু মাস্টারপ্ল্যান করা জরুরি।
পরিকল্পিত সীমানা ও পরিবেশ রক্ষা: কংক্রিটের ইট-পাথরের রাজত্ব না বানিয়ে, প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে বসার স্থান, হাঁটার ট্রেইল ও পরিবেশবান্ধব বিশ্রামাগার গড়ে তোলা সম্ভব।
ইকো-ট্যুরিজমের প্রসার: দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, পাখির নিরাপদ আবাস্থল সংরক্ষণ ও কঠোর প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে একে একটি আদর্শ ‘ইকো-ট্যুরিজম জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
পর্যটকের ব্যাপ্তি: সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থী, গবেষক, আলোকচিত্রী এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বদলে যেতে পারে স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র
মাঝের চরকে কেন্দ্র করে পর্যটন ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে আমতলীর আর্থ-সামাজিক চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
কর্মসংস্থান: স্থানীয় নৌযান চালক, গাইডিং সেবা, ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান এবং কুটির শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
দেশীয় পণ্যের বাজার: স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য ও হস্তশিল্প সরাসরি পর্যটকদের কাছে বিপণনের সুযোগ তৈরি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
নিরাপদ যোগাযোগ ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের আহ্বান
মাঝের চরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা। নদীপথে যাতায়াতের জন্য মানসম্মত ও লাইফ-জ্যাকেট সমৃদ্ধ নৌযান, সুরক্ষিত ঘাট এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে নয়, বরং একে আগলে রেখে যদি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়-তবে এই মাঝের চর বরগুনা জেলার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে একটি অনন্য ঠিকানা হিসেবে ঠাঁই করে নেবে। পায়রা নদীর বুকে জেগে থাকা এই সবুজ দ্বীপ তাই আজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুভদৃষ্টির অপেক্ষায়।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: