কাজ শেষ হওয়ার আগেই সেতুর সংযোগ সড়কে ধস
বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দুই দশকে একের পর এক পাকা অবকাঠামো নির্মাণ করায় বনের স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওয়াচ টাওয়ার, সেতু, ডরমিটরি, গবেষণা কেন্দ্র ও পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে বনটি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
শুধু তাই নয়। এখানকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সব প্রকল্প চলমান, সেগুলোর মান নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সম্প্রতি প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর সংযোগ সড়ক ও গাইডওয়াল ধসে পড়ায় উন্নয়ন কাজের মান এমন প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
২০০৪ সালে তৎকালীন সরকারের সময়ে বনকে সমৃদ্ধ করতে ইউএসএআইডির অর্থায়নে ‘নিসর্গ’ প্রকল্পের আওতায় সাতছড়ির ২৪৭ হেক্টর বনভূমিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে স্থানীয়দের নিয়ে সহব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়।
এরপর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যানে একাধিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। চালু হয় টিকিট ব্যবস্থা এবং শীত মৌসুমে পিকনিকের আয়োজন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব উদ্যোগে বন সংরক্ষণের চেয়ে পর্যটন সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, এক সময় নির্মিত উদ্ভিদ গবেষণা কেন্দ্রটি এখন অযত্নে জঙ্গলে ঢেকে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে নির্মিত স্থাপনার অনেকগুলো তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। অন্যদিকে বনভূমির ভেতরে মানুষের চলাচল ও যানবাহনের চাপ বাড়ায় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে।
পর্যটকদের চলাচল সহজ করতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ এখনও অসম্পূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ বিল ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ কাজ শেষ হওয়ার আগে সম্প্রতি সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক ধসে গেছে এবং গাইডওয়ালের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কংক্রিটের ব্লক সরে গিয়ে জিওটেক্সটাইল ব্যাগ ছিঁড়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও যথাযথ তদারকির অভাবে সামান্য বৃষ্টিতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বনের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় এ সেতুটির ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে বালুর বস্তা ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাতছড়ি ঘুরতে আসা পর্যটক নিজামুল হক বলেন, অনেক দূর থেকে এসেও হতাশ হতে হয়েছে। নির্মাণকাজের এমন অবস্থা দেখে খারাপ লেগেছে। শুরু থেকেই ঠিকভাবে তদারকি হলে এমন হতো না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) ফিল্ড সমন্বয়ক ওমাইয়া ফেরদৌস বলেন, সাতছড়ির প্রকৃত সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। বনে যত বেশি মানুষের চাপ পড়বে, তত বেশি বন্যপ্রাণীর আবাস ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বনকে বনের মতোই থাকতে দিতে হবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বন বিভাগ বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছে। বর্তমানে সাতছড়িতে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে সব অবকাঠামো নির্মাণ বন বিভাগের একক সিদ্ধান্তে হয়নি।
টিকিটের মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে তিনি জানান, পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণে টিকিটের মূল্য বাড়ানো হয়েছে, এর ফলে বর্তমানে বনে মানুষের চাপ কমেছে এবং জীববৈচিত্রে বন ভরে উঠেছে।
তাঁর এমন বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, বনের পরিবেশ প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে। এর কারণে বনের পশুদের নিরাপদ আবাস ও খাদ্য উৎসের সংকট তীব্র হচ্ছে। অনেক সময় তারা লোকালয়ে চলে আসছে খাদ্যের খোঁজে।
উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ও সেতুর দুরবস্থা সম্পর্কে চুনারুঘাট উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ছড়ার তীব্র স্রোতে সংযোগ সড়ক ও গাইডওয়ালের অংশ ধসে গেছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজেও কোনো গাফিলতি ছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ দলের মতামতের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নিমাণ করা হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: