রক্তাক্ত কলমের আর্তনাদ—সোহেল থেকে সাগর-রুনি: সাংবাদিক নিরাপত্তাহীনতার অন্তহীন অধ্যায়।।
নজরুল ইসলাম আলীম:
বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক সোহেলের উপর নৃশংস হামলার ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল—বাংলাদেশে সত্য বলার মূল্য এখনও রক্ত দিয়েই পরিশোধ করতে হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের চলমান বাস্তবতার নতুন সংযোজন, যেখানে সাংবাদিকতা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ পেশায় পরিণত হচ্ছে।প্রতিটি অঞ্চলে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী থাকে, যারা ক্ষমতা, অর্থ ও ভয় দেখিয়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখে। কলসকাঠী ইউনিয়নে তথাকথিত “ভূমিদস্যু কামাল বাহিনী”র বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করাই সাংবাদিক সোহেলের অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের শক্তিগুলো কখনোই চায় না তাদের অপকর্ম জনসম্মুখে আসুক। তাই তারা সাংবাদিকদের কলম থামাতে চায় ভয় দেখিয়ে, হামলা চালিয়ে, কিংবা চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়ে।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্র কি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে, নাকি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে?সাংবাদিকতা: দায়িত্ব না বিপদের নাম?সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা, যা সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে এই পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত জীবননাশের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। মাঠপর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তারা সরাসরি দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের মুখোমুখি হন।এই পরিস্থিতি নতুন নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে এটি একটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।সাগর-রুনি থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাংবাদিক নিরাপত্তার আলোচনায় সবচেয়ে আলোচিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড। ২০১২ সালের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও, এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এই হত্যার পূর্ণাঙ্গ বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি।এই একটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজকে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বারবার তদন্ত, সময় বৃদ্ধি, আশ্বাস—সবকিছুই হয়েছে; কিন্তু ন্যায়বিচার আজও অধরা।এই বিচারহীনতা শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা নয়; এটি একটি বার্ত—“অপরাধ করলেও পার পেয়ে যাওয়া যায়।” আর এই বার্তাই নতুন নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।সাংবাদিক সোহেলের উপর হামলা সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ, যেখানে অপরাধীরা নিশ্চিত যে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তারা জানে, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকলে আইন তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
আজ সোহেল হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন; কাল হয়তো আরেকজন সাংবাদিক একই পরিণতির শিকার হবেন—এই আশঙ্কা অমূলক নয়।সংবিধান নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বাধীনতা কতটা কার্যকর? যখন একজন সাংবাদিক সত্য প্রকাশের কারণে হামলার শিকার হন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি সংবিধানের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।বর্তমানে দেশে সাংবাদিক সুরক্ষার জন্য কার্যকর ও নির্দিষ্ট কোনো শক্তিশালী আইন নেই, যা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক উদ্যোগ অনেক সময়ই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপের বর্তমান সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজের প্রধান দাবি—শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ। একটি আধুনিক, কার্যকর এবং কঠোর “সাংবাদিক সুরক্ষা আইন” প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন—
১. বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন:
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা, হুমকি ও হত্যার জন্য আলাদা আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
২. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল:
সাংবাদিক নির্যাতনের মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
৩. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা:
যে এলাকায় সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে, সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৪. মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা জোরদার:
ঝুঁকিপূর্ণ সংবাদ কভারেজের সময় সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. পুরনো মামলাগুলোর সুরাহা:
বিশেষ করে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ আলোচিত ঘটনাগুলোর দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। এই স্তম্ভ যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়বে।সোহেলের রক্তাক্ত শরীর আমাদের কাছে একটি বার্তা নিয়ে এসেছে—“সত্য বলার অধিকার রক্ষা করুন।” আর যদি আমরা এই বার্তাকে উপেক্ষা করি, তাহলে আগামী দিনে আরও অনেক সোহেল, আরও অনেক সাগর-রুনি আমাদের সামনে আসবে।আজ সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার—আমরা কি একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই, নাকি এমন একটি সমাজ যেখানে সত্য বলা অপরাধ?সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়; এটি সত্য, ন্যায়বিচার এবং একটি সভ্য সমাজকে রক্ষা করা।সোহেলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক—আর সেইসাথে প্রতিটি সাংবাদিকের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা হোক।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- রক্তাক্ত* কলমের,আর্তনাদ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: