হত্যা মামলায় বিক্ষত সাংবাদিকতা
চতুর্থ স্তম্ভে পরিকল্পিত আঘাত * অর্ধশত মামলায় ২৮২ সাংবাদিক আসামি
ছোট ছোট মিছিল। কিছু উত্তাল তরুণ মুখ।
গলা ছেড়ে স্লোগান—‘তুমি কে, আমি কে/রাজাকার, রাজাকার’; ‘এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচার কবে যাবি’। মিছিলের সামনে-পেছনে ছুটছেন সাংবাদিকরা।
কেউ ক্যামেরায় বন্দি করছেন উত্তাল মুহূর্ত, কেউ মোবাইল ফোনে পাঠাচ্ছেন লাইভ আপডেট। রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর নজরদারি, হুমকি, হামলা আর বাধা পেরিয়ে তাঁরাই পৌঁছে দিয়েছেন খবর।
কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে, কিছু হারিয়ে গেছে অদৃশ্য সেন্সরের অন্ধকারে। তবু দমে যাননি সাংবাদিকরা।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে কর্তৃত্ববাদী সরকারের। পাল্টে যায় রাজনৈতিক পটভূমি।
আন্দোলনে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে একের পর এক মামলা হয়। আর সেসব মামলার আসামির তালিকায় উঠে আসে এমন কিছু নাম, যাঁদের হাতে বন্দুক নয়, ছিল কলম, ক্যামেরা, বুম, মাইক্রোফোন। তাঁরা আর কেউ নন—নিবেদিতপ্রাণ তথ্যসেবক সাংবাদিক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী দেড় বছরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, যে সাংবাদিক জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করেছেন, তিনিই হয়ে গেছেন আসামি। যে মানুষ রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের সাক্ষ্য বহন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁকেই দাঁড় করানো হয়েছে কাঠগড়ায়।
ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে গেছেন সাংবাদিকরা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো—আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আর সংবাদমাধ্যম হলো এদের নজরদার, প্রহরী। তাই সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরের কিছু বিষয়কে হাতিয়ার বানিয়ে রাষ্ট্রের সেই চতুর্থ স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হয়েছে—এমনটাই মনে করেন আইনবিদসহ বিশিষ্টজনরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে নজিরবিহীন নিগ্রহের শিকার হন সাংবাদিকরা। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জর্জরিত করা হয় গোটা সংবাদমাধ্যমকে। হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ ৪৯টি মামলায় আসামি করা হয় দেশের অন্তত ২৮২ জন সাংবাদিককে। এর মধ্যে ১৭৪ জন সাংবাদিক হত্যা মামলা, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলা, ৩৭ জনকে নাশকতা মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে; অনেককে আত্মগোপনে, অনেককে আবার কাটাতে হচ্ছে যাযাবরের জীবন।
ইউনূস জামানার দেড় বছরে সাংবাদিক নিপীড়নের বিষয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তৈরি গবেষণার তথ্য পাওয়া গেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে বেশি ছিলেন সরাসরি হামলার শিকার। এ সময় ৫৮৫ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। হত্যা মামলার শিকার হয়েছেন ১৭৪ জন, হত্যাচেষ্টা মামলার শিকার ১২ জন, নাশকতা মামলার শিকার ৩৭ জন এবং সরাসরি হত্যার শিকার হয়েছেন ছয়জন সাংবাদিক।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ৬২২ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হন। এর মধ্যে হামলা করা হয় ৪৫৮ জনকে, হত্যা মামলায় জড়ানো হয় ১৪০ জনকে, নাশকতা মামলার শিকার হন ২১ জন এবং একজন সাংবাদিক নিহত হন।
২০২৪ সালের আগস্ট-ডিসেম্বর সময়ে মোট ১৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। এ সময় ৮৫ জন হামলার শিকার হন, ৩১ জন হত্যা মামলা, ১০ জন হত্যাচেষ্টার মামলা এবং ১৬ জন নাশকতা মামলার শিকার হন। একই সময় পাঁচজন সাংবাদিক নিহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এমএসএফ। এর মধ্যে ৪২ জন হামলার শিকার এবং তিনজন হত্যা মামলার শিকার হয়েছেন।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৭ মাসে অন্তত ৪২৭টি হামলায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক নিগ্রহের শিকার হন। এতে ছয়জন নিহত, ৩৭৯ জন আহত, ১০৩ জনকে হুমকি ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২১৮ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১৮৯ জন সাংবাদিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন বলেও তথ্য টিআইবির।
গতকাল আবার সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানিয়েছেন, তাঁরা বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ জন, এর মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৯৪ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়ে এসেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী সেটা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন।
সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হবে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ ভুল বা কাল্পনিক আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা চলায় বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
‘স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনে এই নামে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের ধারা নেই এবং এটি মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে এমন একটি সময় আসবে যখন তাঁরা তাঁদের ওপর হওয়া এই অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
অদ্ভুত যত মামলা: সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, অনেক মামলাই মূলত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের দাঁড় করানোর এক ধরনের কূটকৌশল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, হত্যার শিকার ব্যক্তির পরিবার মামলা সম্পর্কে জানেই না। তারা চেনে না বাদী কে, আসামি কে।
আমরা অনুসন্ধানের যত গভীরে যাই ততই বিস্মিত হই। কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ী সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান দীর্ঘদিন ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে জানতে পারেন, ছাত্র পরিচয় দিলেই ফ্রিতে চিকিৎসা মেলে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাচার কূটকৌশলে বিবাহিত-অছাত্র আশিক হয়ে যান ছাত্র। আন্দোলনের সঙ্গে লেশমাত্র সম্পর্ক নেই, অথচ বনে যান আন্দোলনকারী। বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে মৃত্যুর পর এই আশিক হয়ে যান জুলাই শহীদ। গেজেটেও ওঠে তাঁর নাম, মেলে সরকারি অর্থ সহায়তাও। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়, যেখানে আসামি করা হয় স্থানীয় সাংবাদিকদের।
এই মামলায় আসামি করা হয় কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আব্দুল খালেক ফারুক, নিউজ২৪ টেলিভিশনের প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির সূর্য এবং এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের প্রতিনিধি ইউসুফ আলমগীরকে।
মামলার নথিতে দেখা যায়, এ মামলার বাদী কুড়িগ্রাম পৌর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি রুহুল আমিন। আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেতৃস্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নেননি। তবু কেন তিনি এ মামলার বাদী হলেন, সাংবাদিকদেরই কেন আসামি করলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আমরা যোগাযোগ করি রুহুল আমিনের সঙ্গে।
গতকাল দুপুরে সরাসরি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে তিনি আপত্তি জানান। মোবাইলে এ বিষয়ে আলাপ করতে গেলে প্রশ্ন শুনেই তিনি খেপে যান। রাগান্বিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আপনি তো স্বৈরাচারের দোসর।’
সাংবাদিকদের আসামি করা এবং নিহতের পরিবারের সদস্যরা থাকতে আপনি কেন বাদী হলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি একজন জুলাইযোদ্ধা, এটি আমার দায়িত্ব ছিল। সেই দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই আমি বাদী হয়েছি।’ এক পর্যায়ে তিনি মামলার এজাহার দেখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘এজাহারে যা উল্লেখ করেছি, সেটাই সত্য। আপনার আরো কিছু জানার থাকলে কোর্টে শুনানি হবে, সেখানে আসেন, কথা হবে, দেখা হবে।’
জানা গেছে, সদর থানার তৎকালীন ওসি হাবিবুল্লাহর কারসাজিতে আশিকের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলাটি করা হয়েছিল। তিনিই ছিলেন এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। বর্তমানে নীলফামারীর ডোমার থানায় কর্মরত হাবিবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সব অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ‘আমি এগুলো কিছু জানি না। আমি এসবের দায়িত্বে ছিলাম না।’
এবার আসা যাক পাশের জেলা লালমনিরহাটে। সরকার পতনের পর ‘স্বৈরাচারের দোসর নিধন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড নামানো শুরু হয়। পাটগ্রাম উপজেলার কাউয়ামারি বাজারে আনন্দ মিছিল বের হয়। সেই মিছিল থেকে স্থানীয় একটি কলেজের সাইনবোর্ড খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় ইসলামপুর ঝালংগী এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে মাদরাসাছাত্র আজিজুল ইসলাম।
জানা গেছে, ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর গত বছরের ৩০ জুন উৎসাহী একজন বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে অন্যদের সঙ্গে আসামি করা হয় দুজন সাংবাদিককেও। একজন পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আজিজুল হক দুলাল, আরেকজন দৈনিক সমকালের উপজেলা সংবাদদাতা মামুন হোসেন সরকার।
ছাত্রদের আন্দোলন প্রতিহত করতে গিয়ে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট প্রাণ হারান রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মাহামুদুল হাসান মুন্না। সেই ঘটনাও চোখ এড়ায়নি সুযোগসন্ধানী চক্রের। ওই বছরের ২৯ আগস্ট আদালতে হত্যা মামলা করলে মামলাটি রংপুর মেট্রোপলিটন আদালত কোতোয়ালি থানাকে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। মামলায় ৫৪ নম্বর আসামি করা হয় কালের কণ্ঠের লালমনিরহাট প্রতিনিধি হায়দার আলী বাবুকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওপরের তিনজনের দুজন জুলাই শহীদ হিসেবে গেজেটেও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদদের নামের তালিকাসংবলিত গেজেট প্রকাশ করে। উপসচিব হরিদাস ঠাকুর স্বাক্ষরিত ওই গেজেটে দেখা যায়, ব্রেন টিউমারে মৃত্যুবরণকারী আশিকুর রহমানের গেজেট নম্বর ২১৭ এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যাওয়া আজিজুল ইসলামের গেজেট নম্বর ৭১৮। (অদ্ভুত মামলাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সবিস্তারে থাকবে আগামী পর্বে)
সাহায্যের টোপ দিয়ে সই: রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী মো. রায়হান আকন। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা মো. কালাম আকন গত বছরের ২৮ মার্চ বাড্ডা থানায় বাড্ডা থানায় একটি মামলা করেন।
মামলার নথি মতে, ওই মামলায় প্রধান আসামি শেখ হাসিনা, আর ২৭ নম্বর আসামি মুজাহিদ প্রিন্স, যিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে বরিশালে সাংবাদিকতা করেন। ঢাকার পল্টনের ঘটনায় আরেকটি হত্যাচেষ্টা মামলায়ও প্রিন্সকে আসামি করা হয়েছে।
ঢাকার ঘটনায় বরিশালের সাংবাদিক আসামি কেন—নেপথ্য জানতে চলে অনুসন্ধান। পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় বাদী কালাম আকনের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মূর্খ মানুষ। সাহায্য দেওয়ার কথা বলে গ্রামের প্রতিবেশী আইনজীবী মশিউর রহমান কিছু কাগজে আমার সই নেন। পরে জানতে পারি সেটা নাকি মামলার বিষয়। ওই মামলায় পটুয়াখালীসহ সারা দেশের শত শত লোককে আসামি করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেকে আমার বাড়িতে এসেছে। আসামির তালিকায় আমার আত্মীয়-স্বজনও আছে। এই মামলা দিয়ে মশিউর লাখ লাখ টাকা ব্যবসা করেছে। আমি জানলে এটা কোনোভাবেই হতে দিতাম না। সাংবাদিক, সরকারি চাকরিজীবীসহ নিরীহ লোকজনকে মামলায় আসামি করে সে ফায়দা লুটছে। এ মামলা থেকে যাতে নিরীহ লোকজনকে বাদ দেওয়া হয়, সরকারের কাছে আমার এটাই দাবি।’
অভিযোগ রয়েছে, মাদারবুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু হানিফ ও তাঁর ছেলে অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান এই হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে মামলা বাণিজ্য করেছেন। গত বছরের অক্টোবরে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মশিউর ও মামলার বাদী কামালের কথোপকথনের কল রেকর্ড প্রকাশ করা হয়। সেখানে শোনা যায়, মশিউর নানাভাবে কামালকে প্রলোভন দেখাচ্ছেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘যারা শহীদ হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মতো ওই রকম একটা ভাতা হবে। আমি আব্বুর (আবু হানিফ) সঙ্গে আলাপ করছি। তারপর আপনার কাজ হাতে নিছি। আমি আব্বুকে বলেছি, মামলা না করলে তো তার কিছু হবে না, আর কোনো কিছুই করতে পারব না তার জন্য। আব্বু বলার পর আপনার মামলা হাতে নিয়েছি।’
এদিকে মামলা বাণিজ্যের আরেক সদস্য পটুয়াখালীর লোহালিয়া এলাকার জসিম উদ্দিন রানা সিকদার। ওই প্রতিবেদনে রানা ও মশিউরের মামলার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বৈঠকের আলোচনার গোপন রেকর্ডও প্রকাশ করা হয়। রেকর্ডে শোনা যায়, রানা মশিউরকে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘এই মামলায় আমার দুজন আসামির সঙ্গে কথা হয়েছে। এই দুই আসামির একজন আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে। মনির খাঁ এক লাখ টাকা দিছে। আমাকে পুরো মামলাটায় স্টপ করে দিসে। কোনো আসামির সঙ্গে আমি যোগাযোগ করব না।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে কল করলে সেটি রিসিভ করেননি মশিউর রহমান। এরপর একাধিকবার কল করলেও তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অডিও রেকর্ডগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে পটুয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি কাইয়ুম জুয়েল বলেন, ‘রেকর্ডগুলো প্রকাশের পর এদের আসল চেহারা সামনে আসে। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু হানিফকে তাঁর পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
জানা গেছে, একুশে টেলিভিশনের সাংবাদিক প্রিন্স পটুয়াখালী জেলা টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক। প্রিন্স বলেন, ‘আমি পেশাগত দায়িত্ব পালন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। ঢাকার যেসব ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, সেসবের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘এভাবে একের পর এক মামলায় আসামি করায় পরিবার নিয়ে মানসিক চাপে আছি।’
মামলা বাণিজ্যের ফাঁদে আরো ৩ সাংবাদিক : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো পাশে নিহত হন আফতাবনগরের বাসিন্দা আল-আমিন। ঘটনার প্রায় চার মাস পর আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের চাচা রহমান মাল।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, ওই একই ঘটনায় আরেকটি মামলা হয় রাজধানীর হাতিরঝিল থানায়। আর সেই মামলার ৮৪ নম্বর আসামি করা হয় বরিশালের তিন সাংবাদিককে। এই মামলাটির বাদী মো. মোজাহারুল। তাঁকে চেনেন না নিহতের পরিবার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের সরকারি তালিকায় নাম রয়েছে আল-আমিনের। কিন্তু তাঁর পরিবার এখনো কোনো আর্থিক সহায়তা না পেলেও আল-আমিনের মৃত্যুকে পুঁজি করে চলছে মামলা বাণিজ্য। দুটি মামলার মধ্যে ঘটনাস্থলের বর্ণনা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন তথ্য।
আল-আমিনের চাচা রহমান ও স্বজনরা বলেন, হাতিরঝিল থানার মামলাটির তথ্য তাঁরা পুলিশ সূত্রে এবং একজন আসামির মাধ্যমে জানতে পারেন। তাঁদের প্রশ্ন, পরিবারের অগোচরে কিভাবে একই ঘটনায় একাধিক মামলা হলো, আর সেখানে কারা, কী উদ্দেশ্যে বাদী হলেন?
এ ধরনের অদ্ভুত মামলাকাণ্ডে ক্ষোভ ও বিস্ময় দেখা দিয়েছে সাংবাদিকদের মধ্যে। ঘটনার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক না থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তাঁদের এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে তাঁদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই মামলার আসামি তিন সাংবাদিক হলেন বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, বণিক বার্তার বরিশাল প্রতিনিধি এম মিরাজ হোসাইন ও স্থানীয় দেশ জনপদ পত্রিকার সম্পাদক তৌহিদুল মাজিদ মীর্জা রিমন।
মামলার বাদী মোজাহারুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে একাধিকবার তাঁর মোবাইল ফোনে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ছাত্রলীগ থেকে জুলাইযোদ্ধা, পরে হত্যা মামলা: সিরাজগঞ্জে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সহিংস ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলা ঘিরে রহস্যজনক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেদিন আসিফ ও শাহীন নামে দুই তরুণ নিহতের ঘটনায় একটি মামলা হয়। মামলায় অন্যদের সঙ্গে আসামি করা হয় দুই সাংবাদিককে। তাঁরা হলেন বিডিনিউজ ও কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি ইজরাইল হাসান বাবু এবং বৈশাখী টিভির জেলা প্রতিনিধি সুজিত সরকার। বাদী আসমানী বেগম।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪ আগস্ট তৎকালীন সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরির বাসভবনে আটকে রেখে আসিফ ও শাহীনকে হত্যা করা হয়। দুজনকে বানানো হয় জুলাইযোদ্ধা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যে দুজনের হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে তাঁরা মূলত ছাত্রলীগকর্মী। আগের দিন সিরাজগঞ্জে সহিংসতায় বিএনপির তিন নেতাকর্মী নিহত হলে গোটা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর জের ধরে বিক্ষুব্ধরা স্থানীয় এমপির বাসভবনে আগুন দেয়। সেখান থেকে দুজনের অগ্নিদগ্ধ কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
অনুসন্ধানকালে আমাদের কাছে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও ফুটেজ আসে। সেখানে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের আন্দোলনে, সভা-সমাবেশে সামনের সারিতে দুই বন্ধু আসিফ ও শাহীন। ৪ আগস্ট গোটা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এমপির বাসায় আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখানেই নির্মমভাবে প্রাণ হারান।
সাংবাদিক বাবু জানান, সাংবাদিকদের মধ্যে একটি পক্ষ ও স্থানীয় সমন্বয়করা যোগসাজশ করে আসিফের মা আসমানী খাতুনকে বাদী বানিয়ে মামলাটি করেছিলেন। ওই মামলায় জেলার সব কটি উপজেলা থেকে আসামি করা হয়েছে। সাংবাদিক-ব্যবসায়ী এমনকি পাঁচজন প্রবাসীকেও আসামি করা হয়েছে। মূলত বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এই মামলা হয়েছিল।
বাবুর ভাষ্য, শুরুতে হেনরির বাড়িতে নিহত দুজনকে ছাত্রলীগ সমর্থক হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে প্রায় তিন মাস পর তাঁদের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী’ দাবি করে হত্যা মামলা করা হয়।
বাদীর সঙ্গে কথা বলতে মামলার এজাহারে থাকা মোবাইল নম্বরে রবিবার বিকেলে কল করলে রিসিভ করেন মো. শাহানুর নামে এক ব্যক্তি। তিনি বাদীর ফুপাতো ভাই। তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে শহরের একডালা পুনর্বাসন এলাকায় অবস্থিত আসমানী খাতুনের বাড়িতে গেলে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, কারসাজির এই মামলার ফাঁদে পড়ে গেছেন খোদ বাদীর ভাই যুবলীগ নেতা মো. নসিবও।
এ মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে সিরাজগঞ্জ সদর থানার এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সোহাগ বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। আদালতে কোনো প্রতিবেদন এখনো দেওয়া হয়নি। মামলার অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি।
ওসির কেরামতির বাদী: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে আহত হয়ে দুপুরে জয়পুরহাটের কালাই হাসপাতালে মারা যান শিক্ষার্থী নজিবুল সরকার বিশাল (১৯)। তাঁর বাড়ি পাঁচবিবি উপজেলার রতনপুর গ্রামে। ১৮ আগস্ট তাঁর বাবা মজিদুল সরকার মালেক বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ১২৮ জনের নামে জেলায় প্রথম হত্যা মামলা করেন, যেখানে ১২২ নম্বর আসামি করা হয় সাংবাদিক আলমগীর চৌধুরীকে। মামলার দাখিলকারী আইনজীবী আব্দুল মোমেন ফকির। এই মামলায় তিনি শুধু আইনজীবী নন, সাক্ষীর তালিকায়ও আছেন চার নম্বরে। আর তাঁর ছেলে জেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা এ এইচ হাসিবুল হক সানজিদের নাম আছে দুই নম্বরে।
জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, ‘আমি বাদীপক্ষের হয়ে মামলা কোর্টে ফাইল করেছিলাম। সেই মামলাটা এজাহাররূপে গণ্য করে থানায় পাঠিয়ে দিলে ওটা জিআর মামলা হয়ে গেছে। জিআর মামলা হলে তখন সেটা গভর্নমেন্ট বাদী হয় এবং সেই মামলা গভর্নমেন্টের লোকেরাই দেখেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘মামলার আসামিদের তালিকা শুধু বাদীপক্ষই নয়, পলিটিক্যাল লিডাররাও দিয়েছেন।’
সংবাদ প্রকাশের অপরাধে হত্যা মামলা কেন—এমন প্রশ্ন তুললে আইনজীবী বলেন, ‘হত্যা কেউ করে নাই। হত্যা এমনি হয়ে গেছে। যাঁরা নিহত হয়, তারা এমনিই নিহত হয়।’
এই হত্যা মামলায় তিনি এবং তাঁর ছেলেও সাক্ষী হয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি শান্ত করতে আমি সাক্ষী হয়েছি।’
তবে সাংবাদিকদের আসামি করার বিষয়ে বাদী কিছু জানেন না বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।
যোগাযোগ করা হলে বাদী মজিদুল সরকার বলেন, ‘আমি কোনো সাংবাদিকের নামে মামলা দিইনি। অনেক আসামিকে আমি চিনিও না। আমার ছেলে হত্যার শাস্তি কোনো নির্দোষ মানুষ পাক, সেটা আমি চাই না। আমার ছেলে হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, আমি তাদের বিচার চাই।’
এই ঘটনায় হওয়া নাশকতার মামলায়ও আসামি করা হয় সাংবাদিক আলমগীর চৌধুরীকে। এ মামলার বাদী রাকিব হোসেন আন্দোলনের সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ওই অবস্থায় তাঁকে বাদী করে মামলাটি দায়ের করা হয়।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের রাকিব হোসেন বলেন, ‘মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি ওই সময় আহত অবস্থায় জয়পুরহাট হাসপাতালে ছিলাম। থানার তৎকালীন ওসি হাসপাতালে এসে একটি কাগজে আমার সই নিয়েছেন। পরে শুনি সাংবাদিকসহ ১১৯ জনের নামে আমাকে বাদী করে নাশকতার মামলা করা হয়েছে। অথচ আমি আসামি বা সাক্ষী কাউকেই চিনি না।’
সেই ওসি হুমায়ুন কবির বর্তমানে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত আছেন। গতকাল জানতে চাইলে বাদী রাকিবের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ওসি দাবি করেন, ‘তিনি কখনোই হাসপাতালে গিয়ে স্বাক্ষর করাননি। এই অভিযোগ সঠিক নয়।’
জানা গেছে, দীর্ঘ ২৮ বছর সাংবাদিকতা পেশায় নিযুক্ত আলমগীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুটি হত্যা ও দুটি নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়।
জয়পুরহাটে মামলার শিকার আরো চার সাংবাদিক হলেন—হত্যা মামলায় এটিএন বাংলার রফিকুল ইসলাম ও বিজয় টিভির সাবেক প্রতিনিধি গোলাম মোস্তফা এবং নাশকতা মামলায় চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের হারুনুর রশিদ ও কালের কণ্ঠের পাঁচবিবি উপজেলা প্রতিনিধি সুমন চৌধুরী।
সাংবাদিক খুনের বেলায় উল্টো: অদ্ভুত সব মামলায় সাংবাদিকদের ফাঁসিয়ে দিলেও সাংবাদিক খুনের বেলায় দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এই ঘটনায় নীরব সেই ‘উৎসাহী’ চক্রের সদস্যরা। মামলা তো হয়ইনি, স্বীকৃতিও মেলেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রহারে নিহত হলেও সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিকের (৫৫) নাম জুলাই-শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। একাধিকবার আবেদন করা হলেও ছাত্র সমন্বয়কদের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রবিবার সকালে উপজেলার ধানগড়া মোড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা করে আন্দোলনকারীরা। তখন আওয়ামী লীগের নেতারা পাশেই অবস্থিত রায়গঞ্জ প্রেস ক্লাবে আশ্রয় নেন। সেখানে হামলা চালিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকর্মীসহ সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিককে হত্যা করা হয়। ওই হামলায় অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক আহত হন।
সাংবাদিক প্রদীপের মরদেহ ময়না তদন্ত হলেও এ ঘটনায় মামলা হয়নি। তিনি দৈনিক খবরপত্র পত্রিকার রায়গঞ্জ প্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
নিহত সাংবাদিকের ছেলে সুজন কুমার ভৌমিক বলেন, ‘আমার বাবা কখনোই আওয়ামী লীগ করেননি। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর জুলাই শহীদের মর্যাদা পেতে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কয়েক দফা জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা তথ্য অফিসে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ছাত্র সমন্বয়কদের বিরোধিতার কারণে তা হয়নি। উল্টো তাঁকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়েছে ওরা।’
কারাবাস, আত্মগোপন, চাকরিচ্যুতি: জুলাই-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া বিভিন্ন হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য সাংবাদিকের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় কালের কণ্ঠের কোটালীপাড়া প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বুলু, দৈনিক ভোরের বাণীর চিফ রিপোর্টার এ জেড আমিনুজ্জামান রিপন, আমাদের অর্থনীতির প্রতিনিধি এস এম সাব্বির হোসেন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের টুঙ্গিপাড়া প্রতিনিধি মেহেদী হাসানকে বিভিন্ন মামলায় আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর তারা জামিনে মুক্তি পায়।
অন্যদিকে বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সাবেক সাংবাদিক জে এম রউফ ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের একটি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলে না থেকেও রাজনৈতিক পরিচয় ও পুরনো মতাদর্শিক অবস্থানের কারণে তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। মামলার পর পরিবারকে নিরাপত্তার কারণে গ্রামে পাঠাতে হয়েছে, নিজেও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। একই মামলায় আরো কয়েকজন সাংবাদিকের নাম রয়েছে।
সিরাজগঞ্জে বিএসএসের জেলা প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম ফিলিপসও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাড়ে তিন মাস কারাগারে ছিলেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন। পরে জামিন পেলেও চাকরি হারান, মামলার পেছনে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয় এবং এখনো আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁঁর প্রশ্ন, ‘আমি সাংবাদিকতা করেছি—এটাই কি আমার অপরাধ?’
সিরাজগঞ্জের তাড়াশেও তিনজন সাংবাদিককে হামলার মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এঁদের মধ্যে ভোরের কাগজ পত্রিকার প্রতিনিধি মামুন হোসাইন গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ চার মাস কারাভোগ করেন। আমার সংবাদ পত্রিকার প্রতিনিধি মিনাল সরকার মিলু ও স্থানীয় সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম এখনো আত্মগোপনে।
সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী গতকাল বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি, যাঁদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন।
তিনি বলেছেন, এই মামলাগুলো আমাদের সময়ে হয়নি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেছে। হত্যা মামলাগুলো রিভিউ করা হবে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো ফরমালি প্রত্যাহার করা হবে। মতিউর রহমান চৌধুরী আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, গত তিন মাসে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত হয়নি। সাংবাদিকদের বিষয়গুলো তিনি খেয়াল রাখবেন বলে জানিয়েছেন।’
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: