পরিবারের কর্মসংস্থান চান ভাইরাল লোকসংগীত শিল্পী লাইলী বাউল
ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি :
ফরিদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের এক সাধারণ নারী। জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে অভাব-অনটন, সংসারের দায়-দায়িত্ব আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই সংগ্রাম কখনো তাঁর কণ্ঠের সুর কেড়ে নিতে পারেনি। বরং লোকসংগীতই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের শক্তি, সাহস আর আশ্রয়। সেই নারীই আজ দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ের নাম—লাইলী বাউল।
দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাংলার মাঠে-ঘাটে, হাটে-বাজারে লোকগান গেয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। কখনো খ্যাতির জন্য নয়, শুধুমাত্র গানকে ভালোবেসে। অথচ সেই গানই একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পৌঁছে যায় দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে। মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে মাটির গন্ধমাখা লোকগান নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় বাংলার লোকঐতিহ্যকে।
শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে লাইলী বাউল বলেন, “গান আমার সাধনা, গানই আমার জীবন। মানুষের ভালোবাসা আর গণমাধ্যমের সহযোগিতা ছাড়া আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতাম না।”
তাঁর কথায় ফুটে ওঠে একজন শিল্পীর বিনয় ও কৃতজ্ঞতা। তিনি মনে করেন, তাঁর এই অর্জন মূলত সাধারণ মানুষের ভালোবাসারই প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি গানই তাঁকে এনে দিয়েছে জাতীয় পরিচিতি। কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের নিরলস সাধনা।
লাইলী বাউলের জীবনের আরেকটি বড় পরিচয় তিনি একজন সংগ্রামী মা। সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ছেলে আপন শেখ জানান, দুই ভাই ও দুই বোনের সংসারে মা একাই ছিলেন সবচেয়ে বড় শক্তি। কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি সন্তানদের আগলে রেখেছেন, সাহস জুগিয়েছেন।
“আমার মা পৃথিবীর সেরা মা। তিনি অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। আজ সারা দেশের মানুষ তাঁকে চিনছে, এটা শুধু আমাদের পরিবারের নয়, পুরো ফরিদপুরবাসীর গর্ব,”—বলেন আপন শেখ।
তবে খ্যাতির এই আলোয় দাঁড়িয়েও পরিবারটির বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। পেশায় রংমিস্ত্রি আপন শেখ পরিবারের সদস্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে পরিবারটি আরও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকেও লাইলী বাউলের প্রতি সম্মান ও সহযোগিতার হাত বাড়ানো হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাঁকে আর্থিক অনুদান প্রদান করেছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক মহল থেকেও তিনি পাচ্ছেন সম্মাননা।
তবে এত অর্জন, সম্মান আর পরিচিতির মাঝেও লাইলী বাউলের স্বপ্ন খুব সাধারণ। তিনি মানুষের জন্য গান গেয়ে যেতে চান। সুযোগ পেলে চলচ্চিত্রেও গান গাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে তিনি বলেন, “মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত গানকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই। মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।”
ফরিদপুরের মাটির গন্ধমাখা সেই কণ্ঠ আজ সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে লাখো মানুষের হৃদয়ে। লাইলী বাউলের গল্প শুধু একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, অধ্যবসায়, মায়ের ভালোবাসা এবং মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় জয়ী হওয়ার এক অনন্য উপাখ্যান। তাঁর সুরের পথচলা আরও দীর্ঘ হোক—এটাই এখন ভক্ত-শ্রোতাদের প্রত্যাশা।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: